spot_img

স্মৃতিশক্তি বাড়ানোর বৈজ্ঞানিক উপায়

দৈনন্দিন জীবনে চাবি কোথায় রাখা হয়েছে তা ভুলে যাওয়া। পরিচিত ব্যক্তির নাম মনে করতে না পারা কিংবা জটিল তথ্য স্মরণে ব্যর্থ হওয়া অত্যন্ত সাধারণ অভিজ্ঞতা (Albrecht, 1992) । অনেকেই এমন পরিস্থিতিতে ধরে নেন যে তাদের স্মৃতিশক্তি হয়তো জন্মগতভাবেই অপরিবর্তনশীল বা দুর্বল। তবে, আধুনিক জ্ঞানীয় বিজ্ঞান (Cognitive Science) নির্দেশ করে যে স্মৃতিশক্তি কোনো স্থির জৈবিক অবস্থা নয়, বরং নিয়মিত বৈজ্ঞানিক ও মানসিক অনুশীলনের মাধ্যমে একে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা সম্ভব (Albrecht, 1992) ।

মস্তিষ্কের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াকরণ এবং স্মৃতি গঠনের মনস্তাত্ত্বিক গবেষণার ওপর ভিত্তি করে স্মৃতিশক্তি উন্নত করার প্রধান বৈজ্ঞানিক কৌশলগুলো নিচে সুবিন্যস্তভাবে তুলে ধরা হলো:
 
১. হিপোক্যাম্পাসের ‘রেকর্ড বাটন’ ও ব্রেন অ্যারৌজাল (Brain Arousal)
মানব মস্তিষ্কের লিম্বিক সিস্টেমের অন্তর্ভুক্ত হিপোক্যাম্পাস (Hippocampus) নতুন স্মৃতি গঠনের ক্ষেত্রে টেপ রেকর্ডারের “Record” বাটনের মতো কাজ করে (Albrecht, 1992)। কোনো নতুন তথ্যের মুখোমুখি হওয়ার প্রথম ৩ থেকে ৫ সেকেন্ডের মধ্যে যদি মস্তিষ্কে আগ্রহ, বিস্ময় বা কৌতূহলের মতো মানসিক আলোড়ন (Arousal) সৃষ্টি না হয়, তবে হিপোক্যাম্পাসের সংরক্ষণ প্রক্রিয়া সক্রিয় হয় না (Albrecht, 1992) । ফলে তথ্যটি স্বল্পমেয়াদি স্মৃতি (Short-term memory) থেকে দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতিতে (Long-term memory) স্থানান্তরিত হওয়ার আগেই মুছে যায় (Albrecht, 1992)।
ব্যবহারিক কৌশল: যেকোনো নতুন বিষয় শেখার সময় অন্তত ৩–৫ সেকেন্ড পূর্ণ মনোযোগ বজায় রাখুন, যাতে মস্তিষ্কে তথ্যটি গুরুত্ব পাওয়ার মতো স্নায়বিক উদ্দীপনা তৈরি হতে পারে (Albrecht, 1992)।

২. চিন্তার তিনটি ভাষার মেলবন্ধন (Tri-Sensory Imprinting)
মানুষের সচেতন চিন্তা মূলত তিনটি মাধ্যমে বা ভাষায় কাজ করে—শব্দ (Verbal), দৃশ্য (Visual) এবং শারীরিক সংবেদন বা অনুভূতি (Kinesthetic) (Albrecht, 1992) । তথ্য সংরক্ষণে কেবল একটি মাধ্যম ব্যবহার করলে স্মৃতির স্থায়িত্ব দুর্বল থাকে; কিন্তু তিনটি ভাষার সমন্বিত প্রয়োগ তথ্যকে মস্তিষ্কে গভীরভাবে ধারণ করতে সাহায্য করে (Albrecht, 1992) ।
বাস্তব উদাহরণ: বাজারে গিয়ে ফ্রোজেন অরেঞ্জ জুস কেনার কথা মনে রাখতে চাইলে (Albrecht, 1992) :
Visual: চোখের সামনে একটি উজ্জ্বল কমলা রঙের বরফশীতল ক্যানের ছবি কল্পনা করা (Albrecht, 1992)।
Kinesthetic: ক্যানটি স্পর্শ করলে হাতে যে তীব্র ঠান্ডা অনুভূতি হবে তা অনুভব করা (Albrecht, 1992)।
Verbal: নামটি স্পষ্ট স্বরে উচ্চারণ করা, যা স্বরযন্ত্রের মোটর নার্ভ ও শ্রবণ ইন্দ্রিয়কে সক্রিয় করে (Albrecht, 1992)।

৩. অবাস্তব ও গতিশীল দৃশ্যকল্পের সংযোগ (Outlandish Story Technique)
মানব মস্তিষ্ক একঘেয়ে বা সাধারণ বিষয়ের চেয়ে অস্বাভাবিক, হাস্যকর ও গতিশীল দৃশ্যকল্প দ্রুত চিহ্নিত করে এবং তা স্মরণে রাখে (Albrecht, 1992) ।
প্রয়োগ: একাধিক অসংলগ্ন জিনিস মনে রাখতে সেগুলোকে মিলিয়ে একটি কাল্পনিক গল্প তৈরি করা যায় (Albrecht, 1992) । যেমন—অফিসের স্টেশনারি জিনিসপত্র মনে রাখতে কল্পনা করা যেতে পারে যে একটি নোটবুক ডানাবিশিষ্ট বিমানের মতো আকাশে উড়ছে, সেখান থেকে ফিতা নিচে পড়ছে এবং বাতাসে ভাসমান কার্ডগুলো একে একে খামের ভেতরে গিয়ে ঢুকছে (Albrecht, 1992)।

৪. লোকাই পদ্ধতি বা মাইন্ড প্যালেস (Method of Loci)
প্রাচীন গ্রিসের বক্তারা দীর্ঘ বক্তব্য লিখিত নোট ছাড়াই নির্ভুলভাবে উপস্থাপন করতে এই স্থানভিত্তিক কৌশলটি ব্যবহার করতেন (Albrecht, 1992)।
পদ্ধতি: অতি পরিচিত কোনো স্থান (যেমন নিজের ঘর বা নিয়মিত হাঁটার পথ) বেছে নিয়ে সেখানকার নির্দিষ্ট কিছু কাঠামো বা আসবাবকে (যেমন: প্রবেশদ্বার, সোফা, ডাইনিং টেবিল) ক্রমানুসারে চিহ্নিত করা হয় (Albrecht, 1992)। এরপর যেসব তথ্য মনে রাখা প্রয়োজন, সেগুলোর একটি করে প্রতীকী দৃশ্য ওই নির্দিষ্ট আসবাবগুলোতে কাল্পনিকভাবে বসিয়ে দেওয়া হয় (Albrecht, 1992)। তথ্য স্মরণে আনার সময় কেবল সেই কাল্পনিক পথ ধরে হেঁটে গিয়ে নির্দিষ্ট স্থানের প্রতীকগুলো পর্যবেক্ষণ করলেই পুরো তালিকাটি স্মরণে চলে আসে (Albrecht, 1992)।

৫. মানসিক পেগবোর্ড এবং কুকি জার টেকনিক (Pegboard & Cookie Jar)
মেন্টাল পেগবোর্ড: মনের মধ্যে ৫–৬টি হুক বা পেরেকযুক্ত একটি কাল্পনিক বোর্ড কল্পনা করা (Albrecht, 1992)। কোনো কাজের কথা মনে এলে তা একটি কাল্পনিক ছবির মতো করে ওই হুকে ঝুলিয়ে রেখে প্রয়োজন অনুযায়ী মিলিয়ে নেওয়া যায় (Albrecht, 1992)।
কুকি জার টেকনিক: দৌড়ানো বা হাঁটার সময় কোনো নতুন চিন্তা এলে কল্পনা করা যেতে পারে একটি বড় সিরামিক কুকি জার রয়েছে, যার ঢাকনা সরালেই ভেতর থেকে একটি স্প্রিংযুক্ত পুতুল নির্দিষ্ট ধারণার প্ল্যাকার্ড হাতে বের হয়ে আসে (Albrecht, 1992)।

৬. নাম মনে রাখার ৫-সেকেন্ড ফর্মুলা
অধিকাংশ মানুষ পরিচয়ের কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই নাম ভুলে যায়, কারণ সে সময় তাদের মনোযোগ নিজের সামাজিক অবস্থান বা আচরণের দিকে নিবদ্ধ থাকে (Albrecht, 1992)।
ধাপসমূহ:
-পরিচয়ের প্রথম ৫ সেকেন্ড সম্পূর্ণ মনোযোগ ব্যক্তির চেহারা ও উচ্চারিত নামের ওপর দেওয়া (Albrecht, 1992)।
-নামটি শোনার সাথে সাথে কথোপকথনে স্পষ্ট করে পুনরাবৃত্তি করা (Albrecht, 1992)।
-ব্যক্তির চেহারার সাথে সঙ্গতি রেখে তার বুকের ওপর বড় হরফে নামটি লেখা রয়েছে বলে কল্পনা করা, যা পরবর্তী সাক্ষাতে নামটি তাৎক্ষণিকভাবে স্মরণে আনতে সহায়তা করবে (Albrecht, 1992)।
 
৭. মেমোরি ব্যাংকে ইতিবাচক সঞ্চয় (Positive Memory Deposits)
মানুষের মস্তিষ্ককে একটি “মেমোরি ব্যাংক” হিসেবে তুলনা করা যায়, যার একজন অনুগত ক্যাশিয়ার রয়েছে (Schwartz, 1959) [১৫৭, ১৫৮]। যখন কোনো ব্যক্তি নিজের অতীতের ব্যর্থতা ও নেতিবাচক স্মৃতি বারবার তুলে আনে, ক্যাশিয়ার তখন হীনমন্যতা ও মানসিক জড়তার উপাদান সরবরাহ করে (Schwartz, 1959) । বিপরীতে, ঘুমানোর আগে বা অবসর সময়ে জীবনের ছোট ছোট সাফল্য, আনন্দময় অভিজ্ঞতা ও ইতিবাচক অর্জন স্মরণ করলে তা আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করে এবং মনকে সক্রিয় রাখে (Schwartz, 1959)।
 
৮. মস্তিষ্কের পুষ্টি ও নিউরোট্রান্সমিটার (Nutritional Support)
স্মৃতি গঠনের জৈবরাসায়নিক প্রক্রিয়ায় নিউরোট্রান্সমিটার অ্যাসিটাইলকোলিন (Acetylcholine) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যা মনোযোগ ও স্নায়বিক সংযোগ রক্ষায় সহায়ক (Albrecht, 1992)। খাদ্যতালিকায় কোলিন (Choline) এবং লেসিথিন (Lecithin) সমৃদ্ধ উপাদানের উপস্থিতি শরীরে অ্যাসিটাইলকোলিন উৎপাদনে ভূমিকা রাখে, যা স্মৃতিশক্তি তীক্ষ্ণ রাখতে সহায়ক হতে পারে (Albrecht, 1992)।
 
রেফারেন্স (APA 7th Edition)
Albrecht, K. (1992). Brain power: Learn to improve your thinking skills. Prentice Hall.
Schwartz, D. J. (1959). The magic of thinking big. Prentice-Hall.

Related Articles

Stay Connected

0FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles