বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে পা রাখার পর তরুণ-তরুণীদের চোখে থাকে অনেক রঙিন স্বপ্ন। কিন্তু এই হাসিখুশি মুখের আড়ালে অনেকের মনেই বাসা বাঁধে হতাশা, বিষণ্ণতা আর আত্মহত্যার মত ভয়ংকর চিন্তা। সম্প্রতি বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় উঠে এসেছে এক উদ্বেগজনক চিত্র। গবেষণায় দেখা গেছে, পরিবারে বাবা-মায়ের মধ্যকার দ্বন্দ্ব, পিতা-মাতার অবহেলা এবং ভালোবাসার মানুষের কাছ থেকে পাওয়া প্রত্যাখ্যান—এই বিষয়গুলো তরুণদের মনে আত্মহত্যার প্রবণতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
কী বলছে নতুন এই গবেষণা?
‘বাংলাদেশ জার্নাল অফ সাইকোলজি’র সাম্প্রতিক সংখ্যায় (ভলিউম ২৬, জুন ২০২৬) একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের গবেষক ও শিক্ষক ড. মো. শাহীন মোল্লা এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মো. রিপন প্রামাণিক যৌথভাবে এই গবেষণাটি পরিচালনা করেন।
১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী ৪১০ জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর (২১৯ জন ছাত্র এবং ১৯১ জন ছাত্রী) ওপর এই গবেষণা চালানো হয়। উদ্দেশ্য ছিল— পারিবারিক অশান্তি এবং প্রিয়জনের প্রত্যাখ্যান শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে কতটা প্রভাব ফেলে তা খুঁজে বের করা।
কার আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি?
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের মধ্যে আত্মহত্যার চিন্তাভাবনা কিছুটা বেশি। যেখানে ১৯.২০% ছাত্র আত্মহত্যার কথা ভেবেছেন, সেখানে ছাত্রীদের মধ্যে এই হার ২২.৫০%। তবে মজার (ও দুঃখজনক) ব্যাপার হলো, এই চিন্তার পেছনে ছেলে ও মেয়েদের কারণগুলো কিছুটা আলাদা।
ছেলেদের ক্ষেত্রে অন্যতম কারণ ‘পারিবারিক কলহ’
গবেষণায় দেখা গেছে, ছেলেদের মনে আত্মহত্যার চিন্তা আসার অন্যতম বড় কারণ হলো বাবা-মায়ের মধ্যে পারিবারিক অশান্তি বা দ্বন্দ্ব এবং বাবার কাছ থেকে অবহেলা। বিশেষ করে বাবা-মায়ের ক্রমাগত ঝগড়া বা নেতিবাচক সম্পর্ক ছাত্রদের মানসিকভাবে প্রচণ্ড বিপর্যস্ত করে তোলে, যা অনেক সময় তাদের আত্মহননের চিন্তার দিকে ঠেলে দেয়।
মেয়েদের ক্ষেত্রে মূল ধাক্কা ‘সঙ্গীর প্রত্যাখ্যান’
অন্যদিকে, ছাত্রীদের ক্ষেত্রে আত্মহত্যার চিন্তার সাথে সবচেয়ে বেশি জড়িত হলো রোমান্টিক সঙ্গীর (partner) কাছ থেকে পাওয়া প্রত্যাখ্যান বা ব্রেকআপ। পাশাপাশি, বাবা ও মায়ের অবহেলা বা স্নেহ থেকে বঞ্চিত হওয়াও তাদের মনে গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
আমাদের জন্য কী বার্তা দিচ্ছে এই গবেষণা?
আমাদের সমাজে তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যকে অনেক সময় অবহেলা করা হয়। অনেকেই মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়ার পর ছাত্রছাত্রীদের আর কোনো কষ্ট থাকতে পারে না। কিন্তু এই গবেষণা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, একটি সুস্থ ও সুন্দর পারিবারিক পরিবেশের কোনো বিকল্প নেই।
বাবা-মায়ের মধ্যকার সুসম্পর্ক যেমন সন্তানদের মানসিকভাবে শক্ত রাখে, তেমনি তাদের কলহ সন্তানদের মানসিকভাবে ধ্বংস করে দিতে পারে। এছাড়া রোমান্টিক সম্পর্কে প্রত্যাখ্যানের সময়টাতেও তরুণ-তরুণীদের একা না রেখে তাদের পাশে বন্ধু বা পরিবারের মানসিক সাপোর্ট থাকা অত্যন্ত জরুরি।
শেষ কথা
পরিবারকে হতে হবে সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। সন্তান যেন তার হতাশা, কষ্ট এবং যেকোনো কথা নির্দ্বিধায় বাবা-মা বা কাছের মানুষদের সাথে শেয়ার করতে পারে, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করা আজ সময়ের দাবি। কারণ, প্রিয়জনের একটু সাপোর্ট আর ভালোবাসাই পারে একটি অমূল্য জীবন বাঁচাতে।
(তথ্যসূত্র: “Perceived Interparental Conflict, Parental Rejection, and Partner Rejection as Predictors of Suicidal Ideation among University Students in Bangladesh“, বাংলাদেশ জার্নাল অফ সাইকোলজি, ২০২৬)


