বাংলাদেশে শারীরিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে দেশের বিশাল জনসংখ্যার তুলনায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবার পরিধি অত্যন্ত সীমিত। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি যুগান্তকারী ঘোষণা এসেছে সরকারের পক্ষ থেকে। দেশে এলাকাভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কর্নার গড়ে তোলার মাধ্যমে মানসিক চিকিৎসা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সম্প্রতি প্রথম আলো কার্যালয়ে সাজেদা ফাউন্ডেশন ও প্রথম আলোর যৌথ আয়োজনে এক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই গোলটেবিল বৈঠকের বিষয় ছিল “মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারি বেসরকারি অংশীজনদের ভূমিকা চ্যালেঞ্জ নিরোষণে করণীয়” এবং এতে এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। বৈঠকে সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, মনোবিজ্ঞানী এবং জনস্বাস্থ্যবিদরা দেশের মানসিক স্বাস্থ্য খাতের বর্তমান পরিস্থিতি ও সংকট উত্তরণের উপায় নিয়ে আলোচনা করেন।
সংকটে দেশের মানসিক স্বাস্থ্য খাত: পরিসংখ্যান কী বলছে?
বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যের বর্তমান চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ২০১৯ সালে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NMH) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত সর্বশেষ জাতীয় জরিপ অনুযায়ী:
- বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫ কোটি ৪০ লাখ মানুষ কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগছেন।
- প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে এই হার ১৮ শতাংশের বেশি এবং শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে এই হার ১২ শতাংশের বেশি ।
- দেশে প্রায় সাড়ে সাত লাখ মানুষ গুরুতর মানসিক রোগে ভুগছেন।
চিকিৎসা সুবিধার বাইরে ৯২% রোগী
গুরুতর এই সংকটের বিপরীতে দেশে পূর্ণাঙ্গ মানসিক হাসপাতাল রয়েছে মাত্র দুটি। ফলে প্রায় ৯২ শতাংশ মানসিক রোগীই কোনো ধরনের চিকিৎসা সুবিধার আওতায় আসতে পারছেন না। অধিকাংশ পরিবারের দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসার ব্যয় বহন করার মতো আর্থিক সামর্থ্য নেই। তাছাড়া সচেতনতারও তীব্র অভাব রয়েছে। এছাড়া কুসংস্কার, সামাজিক অসহযোগিতা ও বৈষম্যের কারণে রোগী ও তাদের পরিবারগুলো প্রতিনিয়ত হেনস্তার শিকার হচ্ছে। চিকিৎসা পাওয়ার পরও সমাজ ও পরিবারে রোগীদের পুনর্বাসন করা আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
এলাকাভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবা: প্রতিরোধের ওপর জোর
গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, “মানসিক সেবাকে এলাকাভিত্তিক ছড়িয়ে দিয়ে প্রতিরোধে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে”।
তিনি আমাদের স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাব তুলে ধরেন। তার মতে, বাংলাদেশে মানুষ সাধারণত শেষ পর্যায়ে না যাওয়া পর্যন্ত চিকিৎসকের কাছে যায় না। এই সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। একটি স্বাস্থ্যকর সমাজ গঠনে প্রিভেনশন বা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপর জোর দেওয়া হবে। এর অংশ হিসেবে স্থানীয় পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কর্নার গড়ে তোলা হবে।
নারীদের মানসিক স্বাস্থ্য: বিশেষ ঝুঁকি ও বৈষম্য
বৈঠকে চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. হালিদা হানুম আক্তার নারীদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, শারীরিক চিকিৎসায় পরিবারগুলো অর্থ ব্যয় করলেও মানসিক রোগের ক্ষেত্রে অর্থ ব্যয় করতে চায় না। বিশেষ করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ও অর্থ খরচ করার স্বাধীনতা না থাকায় নারীরা মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হন।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী নারীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি
- গর্ভকালীন (Pregnancy), প্রসবপূর্ব এবং মেনোপজের (Menopause) মতো সংবেদনশীল সময়ে নারীরা তীব্র মানসিক সংকটে ভোগেন।
- ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত প্রতি ৪ জনের মধ্যে ৩ জনই নারী। উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস এবং মানসিক স্বাস্থ্যের মতো অসংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত প্রতি ৩ জনের মধ্যে ২ জনই নারী।
তাই বিশেষজ্ঞদের মতে, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পরিকল্পনায় নারী ও পুরুষের সমস্যাকে আলাদা দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করা জরুরি।
জনবল সংকট দূর করতে ‘প্যারা-কাউন্সিলর‘ ও স্থানীয় মডেল
বাংলাদেশে সাইকিয়াট্রিস্ট (মনোরোগ বিশেষজ্ঞ) ও সাইকোলজিস্টের সংখ্যা জনসংখ্যার তুলনায় অত্যন্ত কম। সাজেদা ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জাহেদা ফিজ্জা কবির জানান, এই পেশাদার জনবলের ঘাটতি শুধু বাংলাদেশে নয়, উন্নত বিশ্বেও রয়েছে।
এই সংকটের সমাধানে তিনি ‘প্যারা-কাউন্সিলর’ বা স্থানীয় পর্যায় থেকে পেশাদার ও দক্ষ কমিউনিটি কর্মী গড়ে তোলার ওপর জোর দেন। এই ধরনের মাঠপর্যায়ের কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে এলাকাভিত্তিক মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা প্রদান করা সম্ভব। এই ধরনের প্রচেষ্টা মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি দূর করতে বড় ভূমিকা রাখবে।
ডায়াবেটিস হাসপাতালের মডেল অনুসরণের পরামর্শ
পাবনা মানসিক হাসপাতালের পরিচালক শাফকাত ওয়াহিদ একটি চমৎকার মডেল প্রস্তাব করেন। তিনি বলেন, ডায়াবেটিস হাসপাতালের (যেমন বার্ডেম) মতো প্রতিটি জেলা ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মানসিক চিকিৎসকের ব্যবস্থা করা উচিত। মানসিক রোগীদের ঘন ঘন ডাক্তার দেখানোর প্রয়োজন হয় না; মাসে বা দুই মাসে একবার বিশেষজ্ঞের পরামর্শ এবং নিয়মিত ওষুধ সেবন নিশ্চিত করলেই তারা সুস্থ থাকতে পারেন, যা পরিবারের মাধ্যমেই সম্ভব।
বাজেট ও অন্যান্য চ্যালেঞ্জ
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক সাইফুন্ নাহার জানান, বর্তমানে মাদকাশক্তি ও আচরণগত সমস্যায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা অনেক বেড়েছে। তাদের বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে ৫৫০ জন রোগী আসে এবং ইনডোরে শয্যা ধারণ ক্ষমতা ১২০%। সেবাদানের জন্য বেশ কিছু নতুন ক্লিনিক ও টেলি-সাইকিয়াট্রি বিভাগ চালু করা হলেও প্রয়োজনীয় জনবল ও লজিস্টিক সাপোর্টের ঘাটতি রয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর বাংলাদেশ প্রতিনিধি মনোবিজ্ঞানী হাসিনা মমতাজ জানান, বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ অত্যন্ত কম—মাথাপিছু মাত্র ২.৪ টাকা। তিনি বলেন, সীমিত বাজেটের সঠিক ব্যবহারের জন্য ডিপ্রেশন (অবসাদ), সাইকোসিস এবং মৃগীরোগের (Epilepsy) চিকিৎসায় বিনিয়োগ করলে সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায়। রোগ প্রতিরোধ ও প্রচারণামূলক কার্যক্রমে (Promotion & Prevention) বিনিয়োগ বাড়ালে কম খরচে সবচেয়ে বেশি মানুষকে সুস্থ রাখা সম্ভব।
আশা জাগাচ্ছে সাজেদা ফাউন্ডেশনের ‘প্রশান্তি‘ প্রকল্প
সীমাবদ্ধতার মাঝেও সাজেদা ফাউন্ডেশনের ‘প্রশান্তি‘ প্রকল্প মানসিক রোগীদের পুনর্বাসনে আশার আলো দেখাচ্ছে। গোলটেবিল বৈঠকে মানিকগঞ্জের রুপা আক্তার এবং হবিগঞ্জের মোহাম্মদ সাকিব তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প শুনিয়েছেন। সাজেদা ফাউন্ডেশনের কর্মীদের সহায়তায় মানসিক অসুস্থতা জয় করে তারা এখন মূলধারার চাকরিতে যোগ দিয়েছেন এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন।
উপসংহার ও পরবর্তী করণীয়
বাংলাদেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগের বিকল্প নেই। প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ঘোষিত এলাকাভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কর্নার গড়ে তোলার উদ্যোগটি দ্রুত বাস্তবায়ন করা গেলে চিকিৎসা সুবিধার বাইরে থাকা ৯২% মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। একই সাথে বাজেটের সঠিক ব্যবহার, প্যারা-কাউন্সিলর নিয়োগ এবং নারীদের বিশেষ স্বাস্থ্য চাহিদার প্রতি নজর দেওয়া এখন সময়ের দাবি।
তথ্যসূত্র: ১. সাজেদা ফাউন্ডেশন ও প্রথম আলোর গোলটেবিল বৈঠক: “মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারি বেসরকারি অংশীজনদের ভূমিকা চ্যালেঞ্জ নিরোষণে করণীয়”। ২. জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NMH) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) যৌথ জরিপ ২০১৯।


