আপনি কি খেয়াল করেছেন যে, আপনাদের ঝগড়াগুলো সবসময় একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্ন বা নিয়ম মেনে চলে? হয়তো শুরুটা হয় খুব সামান্য কোনো বিষয় নিয়ে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা বড় কোনো অশান্তিতে রূপ নেয়। পরে আপনারা দুজনেই মানসিকভাবে বিধ্বস্ত বোধ করেন। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘নেতিবাচক চক্র’ (Negative Cycle) বা ‘দুষ্টচক্র’ (Vicious Circle)।
বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী ডা. রাসেল গ্রিগার (২০১৫) এবং সুসান এম. জনসন (২০০৫) এর গবেষণা অনুযায়ী, এই চক্রটি কীভাবে কাজ করে এবং কীভাবে তা থেকে বেরিয়ে আসা যায়, তা নিচে ধাপে ধাপে আলোচনা করা হলো।
১. সম্পর্কের নেতিবাচক চক্র কী?
নেতিবাচক চক্র হলো সঙ্গীদ্বয়ের মধ্যে বারবার ফিরে আসা একটি ধ্বংসাত্মক যোগাযোগের ধরণ। এখানে একজনের নেতিবাচক আচরণ অন্যজনের জন্য ট্রিগার হিসেবে কাজ করে, যা বিনিময়ে আরেকটি নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। পুরো বিষয়টি একটি নিচের দিকে নামতে থাকা সর্পিল গতির (Downward Spiral) মতো কাজ করে। এই প্রক্রিয়ায় দম্পতিরা পরিস্থিতির মূল কারণ ভুলে গিয়ে একে অপরকে দোষারোপ করতে শুরু করে। কাজেই, নেতিবাচক চক্র কেবল ঝগড়া নয়, বরং এটি চিন্তা, অনুভূতি এবং আচরণের একটি শৃঙ্খল।
২. বাস্তব চিত্র: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পারিবারিক কলহের ভয়াবহতা
সম্পর্কের এই নেতিবাচক চক্র বা দুষ্টচক্র ব্যক্তিগত পর্যায়ে মানসিক কষ্টই দেয়। আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামোকে বড়সড় হুমকির মুখে ফেলছে। বাংলাদেশের সরকারি পরিসংখ্যান এবং সাম্প্রতিক পত্রপত্রিকার প্রতিবেদনগুলোতে দাম্পত্য কলহ ও এর ক্ষতিকর প্রভাবের এক উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে:
- বিবাহ বিচ্ছেদের আশঙ্কাজনক বৃদ্ধি: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) এবং জাতীয় দৈনিকগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পারিবারিক অস্থিরতা, মানসিক নির্যাতন এবং যোগাযোগের অভাবের কারণে দেশে বিবাহ বিচ্ছেদের হার রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে। রাজধানী ঢাকাতেই প্রতিদিন গড়ে ৫০টিরও বেশি সংসার ভাঙছে। কেবল ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি কর্পোরেশন এলাকাতেই বছরে ১৩ হাজারেরও বেশি ডিভোর্সের আবেদন জমা পড়ছে। এদের একটি বড় কারণ পারিবারিক মনস্তাত্ত্বিক কলহ এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের অভাব।
- সহিংসতায় রূপ নেওয়া দুষ্টচক্র: বিবিএস (BBS) এবং ইউএনএফপিএ (UNFPA)-এর যৌথ জাতীয় জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশের বিবাহিত নারীদের অর্ধেকেরও বেশি (প্রায় ৫৪%) তাদের স্বামীর দ্বারা জীবনের কোনো না কোনো সময়ে শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এছাড়া প্রায় ৭৬% নারী তাদের জীবনে অন্তত একবার কোনো না কোনোভাবে (শারীরিক, মানসিক, অর্থনৈতিক বা নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ) সঙ্গীর নেতিবাচক আচরণের বা পারিবারিক সহিংসতার শিকার হন।
- গ্রাম ও শহরের অভিন্ন চিত্র: পুলিশ সদর দপ্তর ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের পরিসংখ্যান বলছে, পারিবারিক কলহ ও নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনা শহর কিংবা গ্রাম, সবখানেই সমানভাবে দৃশ্যমান। প্রতিদিন সারাদেশে গড়ে ৫০টিরও বেশি নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা নথিভুক্ত হচ্ছে। এদের একটি বিশাল অংশের পেছনে রয়েছে পারিবারিক অবদমন ও দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত রাগ।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই পরিসংখ্যানগুলো আসলে সম্পর্কের সেই ‘নেতিবাচক চক্রেরই’ চরম সামাজিক বহিঃপ্রকাশ। যখন দম্পতিরা প্রাথমিক আবেগ (কষ্ট, একাকীত্ব) আড়াল করে ক্রমাগত আক্রমণ বা নীরবতার পথ বেছে নেন। সেই ব্যক্তিগত দূরত্ব একসময় আইনি বিচ্ছেদ কিংবা সহিংসতায় রূপ নেয়।
৩. চক্রটি কীভাবে কাজ করে
একটি চক্র সাধারণত নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করে:
ধাপ ১: উদ্দীপক বা ট্রিগার (The Trigger): কোনো একটি ঘটনা নেতিবাচক অনুভূতির জন্ম দেয়। যেমন: সঙ্গী কথা শুনছে না বা দেরি করে ঘরে ফেরা। একে গ্রিগার (২০১৫) ‘অ্যাক্টিভেটিং ইভেন্ট’ বলেছেন।
ধাপ ২: প্রাথমিক আবেগ (Primary Emotion): ঘটনার সাথে সাথেই মনে মনে একটি গভীর ও নরম অনুভূতি তৈরি হয়। যেমন: একাকীত্ব, প্রত্যাখ্যানের ভয় বা নিজেকে অযোগ্য মনে হওয়া। দম্পতিরা সাধারণত এই অনুভূতিটি সঙ্গীকে দেখান না।
ধাপ ৩: মাধ্যমিক আবেগ ও আচরণ (Secondary Emotion & Action): প্রাথমিক কষ্টটি আড়াল করতে আমাদের মনে দ্রুত রাগ, বিরক্তি বা অভিযোগ (মাধ্যমিক আবেগ) জমা হয়। ফলে আমরা সঙ্গীকে সমালোচনা করি বা কথা বলা বন্ধ করে দেই।
ধাপ ৪: সঙ্গীর প্রতিক্রিয়া: আপনার রাগ বা নীরবতা দেখে আপনার সঙ্গী নিজেকে অনিরাপদ মনে করেন এবং তিনি হয় পাল্টা আক্রমণ করেন অথবা নিজেকে গুটিয়ে নেন। এতে আপনি আরও বেশি কষ্ট পান এবং চক্রটি চলতেই থাকে।
৪. একটি বাস্তব উদাহরণ: মাসুম ও মারিয়ার গল্প
মাসুম ও মারিয়ার মধ্যে প্রায়ই টাকার হিসেব নিয়ে ঝগড়া হয়।
ঘটনা: মারিয়া মাসুমকে কিছু বাজার করতে বলেছিলেন যা মাসুম ভুলে গেছেন।
মারিয়ার প্রতিক্রিয়া: মারিয়া রেগে গিয়ে বললেন, “তুমি কখনোই আমার কথার গুরুত্ব দাও না!” তিনি মূলত রাগের মাধ্যমে নিজের সমালোচনা প্রকাশ করলেও, এর গভীরে ছিল তার একাকীত্বের অনুভূতি (প্রাথমিক আবেগ)।
মাসুমের প্রতিক্রিয়া: মাসুম নিজেকে রক্ষায় বললেন, “আমি সারাদিন কাজ করি, তোমার এই ঘ্যানঘ্যানানি অসহ্য!” এটি তার ডিফেন্সিভ বা রক্ষণাত্মক আচরণ। এরপর তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন (উইথড্রয়াল)।
ফলাফল: মাসুম যত দূরে সরে যান, মারিয়া তত বেশি আতঙ্কিত বোধ করেন এবং আরও জোরে চিৎকার করেন। এটিই তাদের সম্পর্কের নেতিবাচক চক্র।
৫. সাধারণ কিছু নেতিবাচক চক্র
ইমোশনালি ফোকাসড থেরাপি (EFT) অনুযায়ী সাধারণত তিন ধরণের চক্র দেখা যায়:
- অনুধাবন এবং গুটিয়ে নেওয়া (Pursue & Withdraw): এটি সবচেয়ে সাধারণ চক্র। এখানে একজন সঙ্গী উত্তরের জন্য মরিয়া হয়ে চাপ দেন (Pursuer), আর অন্যজন শান্ত থাকতে বা ঝামেলা এড়াতে দূরে সরে যান (Withdrawer)।
- আক্রমণ এবং আক্রমণ (Attack &Attack): দুজনেই একে অপরকে দোষারোপ করতে থাকেন এবং কেউ হার মানতে চান না।
- নীরবতা এবং নীরবতা (Withdraw & Withdraw): এখানে দুই সঙ্গীই সংঘাত এড়াতে নিজেদের আবেগ লুকিয়ে রাখেন। একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান এবং নিজেদের মধ্যে কোনো গভীর কথা বলেন না।
- জটিল চক্র (Complex Cycles): বিশেষ করে ট্রমা বা মানসিক আঘাতের শিকার দম্পতিদের মধ্যে এমন চক্র দেখা যায় যেখানে আবেগ খুব দ্রুত এবং চরমভাবে পরিবর্তিত হয়।
৬. এই চক্র থেকে মুক্তির উপায়
ব্র্যাডলি এবং ফারো (২০১৩) এবং ডা. গ্রিগার (২০১৫) এর মতে, রিলেশনশিপ ভালো করতে নিচের পদক্ষেপগুলো নিন:
১) চক্রটিকে চিহ্নিত করুন: প্রথম পদক্ষেপ হলো এই চক্রটিকে চেনা এবং এটিকে ‘অভিন্ন শত্রু’ হিসেবে দেখা। দম্পতিদের বুঝতে হবে যে সঙ্গী শত্রু নয়। আসল শত্রু হল তাদের মধ্যকার এই নেতিবাচক প্যাটার্নটিই। ঝগড়া শুরু হওয়ার সাথে সাথেই বুঝতে চেষ্টা করুন যে আপনারা আপনাদের পুরনো প্যাটার্নে ঢুকে পড়ছেন। একে নাম দিন, যেমন- ‘আমাদের রাগের নাচ’।
২) আবেগের দায়িত্ব নিন : নিজের প্রতিক্রিয়া এবং বিশ্বাসের জন্য ১০০% ব্যক্তিগত দায়িত্ব নেওয়া প্রয়োজন।কাজেই আবেগের দায়িত্ব নিন।
৩) ব্রেক চাপুন (Hitting the Brakes): ঝগড়া যখন চরম পর্যায়ে পৌঁছাবে, তখন আলোচনা থামিয়ে দিন এবং নিজেদের শান্ত করুন।
৪) নিজের ভলনারেবিলিটি বা দুর্বলতা প্রকাশ করুন: রাগের পরিবর্তে আপনার ভেতরে যে ভয় বা একাকীত্বের কষ্ট (প্রাথমিক আবেগ) কাজ করছে, তা সঙ্গীকে জানান। যখন আপনি আপনার আসল কষ্ট শেয়ার করবেন, তখন সঙ্গী আপনাকে আক্রমণ করার পরিবর্তে সহানুভূতি দেখাবেন।
রেফারেন্স:
- Bradley, B., & Furrow, J. (2013). Emotionally focused couple therapy for dummies. John Wiley & Sons.
- Bangladesh Bureau of Statistics. (2022). Report on the survey on prevalence of violence against women 2020. Statistics and Informatics Division, Ministry of Planning.
- Grieger, R. (2015). The couples therapy companion: A cognitive behavior workbook. Routledge.
- Johnson, S. M. (2005). Becoming an emotionally focused couple therapist: The workbook. Routledge.
- Johnson, S. M. (2004). The practice of emotionally focused couple therapy: Creating connection. Brunner-Routledge.
- The Daily Star. (2024, February 18). Rising divorce rates in Dhaka: Lack of communication and emotional distance to blame. https://www.thedailystar.net
- United Nations Population Fund. (2021). Combating gender-based violence in Bangladesh: National insights. UNFPA Bangladesh. https://bangladesh.unfpa.org


