(লেকচার শুনতে ঘুম আসে কারণ ঐ সময় আমাদের মস্তিষ্ক অলস থাকে)
ক্লাসে লেকচার শুনতে কিংবা কারো আলোচনা শুনতে শুনতে অনেকের ঘুম পায়। ফলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মিস হয়ে যায়। কিন্তু লেকচার শুনতে কেন ঘুম পায়? বিজ্ঞানীরা এর কারণ খুঁজে বের করেছেন, নীচে তা আলোচনা করা হল।
১। নিষ্ক্রিয় থাকা (Passive Engagement)
লেকচার শোনার সময় আমরা সাধারণত চুপচাপ থাকি তখন আমাদের মস্তিষ্ক অলস থাকে, এভাবে নীরব শ্রোতা হয়ে থাকতে থাকতে আমাদের মানসিক ক্লান্তি তৈরি হয় ফলে ঝিমুনি আসে। মস্তিষ্কের সক্রিয় অংশগ্রহণ এক্ষেত্রে আমাদেরকে সজাগ রাখতে পারে। যেমন-নোট নেওয়া, প্রশ্ন করা কিংবা মুখে কিছু চিবানো প্রভৃতি।
২। একঘেয়েমি (Monotony)
বক্তার বক্তব্যে যদি বৈচিত্র্য না থাকে বা বক্তা বেশিক্ষণ একইসুরে কথা বলে তবে তা একঘেয়েমি লাগে। সেই সাথে বক্তব্যের বিষয়বস্তু যদি হৃদয়গ্রাহী না হয় তাহলে শ্রোতার মাঝে একঘেয়েভাব তৈরি হয় ফলে, তন্দ্রাভাব চলে আসে।
৩। তথ্যের আধিক্য (Cognitive Load)
একই সময়ে বেশি পরিমাণে তথ্য প্রক্রিয়া করতে মস্তিষ্ককের অনেক বেশি শক্তিব্যায় করতে হয়। জটিল বিষয়বস্তু ও দ্রুত উপস্থাপন করা হলে একই সময়ে মস্তিষ্কে তথ্যের আধিক্য ঘটে ফলে ঐ তথ্যগুলো প্রক্রিয়া করতে যেয়ে আমাদের মস্তিষ্ক অবসন্ন ও শ্রান্ত হয়ে পরে, ফলে ঝিমুনি আসে।
৪। পরিবেশ (Environment)
লেকচার শোনার স্থান বা রুমের পারিপার্শ্বিক পরিবেশ শ্রোতার মাঝে ঘুমের উদ্রেক করতে পারে। বিশেষকরে- স্বল্প আলো, আরাম দায়ক বসার জায়গা, এবং আরামদায়ক তাপমাত্রা শ্রোতার মাঝে ঘুমঘুম ভাবের উদ্রেক করে থাকে। আবার ফ্যান, এসি, কিংবা কম্পিউটারের শব্দ অনেকের মাঝে তন্দ্রা নিয়ে আসেতে পারে।
৫। আগ্রহের অভাব (Lack of Interest)
বক্তৃতার বিষয়বস্তুর প্রতি শ্রোতার আগ্রহ না থাকলে, মস্তিষ্ক ঐ বিষয়ের প্রতি সতর্ক মনোযোগ বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারে না। কারণ এক্ষেত্রে শ্রোতাকে ফোকাস ও একাগ্রতা ধরে রাখতে অতিরিক্ত মানসিক শক্তি প্রয়োগ করতে হয় ফলে মস্তিষ্ক দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পরে এবং ঝিমুনিভাব চলে আসে।
৬। শরীরের সারকাডিয়ান রিদম (Circadian Rhythms)
মানুষের শরীরের প্রাকৃতিকভাবে ঘুমানো ও জেগে উঠার একটা চক্র রয়েছে। এই চক্র অনুযায়ী শ্রোতার শরীরে যে সময় ঘুমানোর প্রোগ্রাম করা আছে সে সময় যদি কোন বক্তব্য শোনে, তবে ঐ শ্রোতা তন্দ্রাছন্ন হতে পারে। বিশেষ করে, দুপুরে খাবার খাওয়ার পর এমনটি হতে পারে।
৭। পানিয় জলের ঘাটতি এবং পুষ্টি (Hydration and Nutrition)
শরীরে পানীয় জল এবং পুষ্টির ঘাটতি থাকলে আমাদের শরীর দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে। আর তাই লেকচার শুনতে শুরু করলেই শ্রোতা দ্রুত ক্লান্ত অনুভব করে এবং তন্দ্রাছন্ন হয়ে পরে।


৮।মনোযোগের ব্যাপ্তিকাল
মনোবিজ্ঞানীরা গবেষণায় দেখেছেন, আমাদের মস্তিষ্ক সাধারণত একটি লেকচারের প্রথম ১০ মিনিট পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারে। ৯ মিনিট ৫৯ সেকেন্ডের পর থেকে মনোযোগ একদম থাকেনা, আর শ্রোতারা তখন ঝিমিয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে বক্তা যদি ১০মিনিট অন্তর অন্তর বিষয়বস্তুতে বৈচিত্র্য আনে, বিরতি দেয় কিংবা গল্প করে তবে শ্রোতার মনোযোগ পুনরায় ফিরে আসে। এভাবে মনোযোগের ব্যাপ্তিকালটা পুরো লেকচার জুড়ে ধরে রাখা সম্ভব আর তাতে তন্দ্রাচ্ছন্নভাবও দূর হবে।
পরিশেষে বলা যায়, ক্লাসে লেকচার শোনার সময় চুপচাপ বসে না থেকে সক্রিয় থেকে, শরীরের যত্ন ও ঘুম-জেগে উঠার চক্রের বিষয়ে সজাগ থেকে, বক্তব্যের বিষয় আগে থেকে দেখে আসার মাধ্যমে একজন শ্রোতা তার ঘুমের ভাব দূর করতে পারে। আবার একজন বক্তা হিসেবে শ্রোতার মনোযোগের পরিধি, বিষয়বস্তু ও কথায় বৈচিত্র্য এনে, জটিল বিষয়কে সহজভাবে উপস্থাপন করে, এবং উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করে শ্রোতার তন্দ্রাভাব দূর করে মনোযোগ ধরে রাখতে পারেন।
লেখকঃ ডঃ মোঃ শাহীনুর রহমান, সহযোগী অধ্যাপক, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।


