দাম্পত্য সম্পর্ক মানব জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। ভালোবাসা, পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সহযোগিতার ভিত্তিতে একটি সুস্থ দাম্পত্য গড়ে ওঠে। তবে বাস্তব জীবনে দেখা যায়, নানা কারণে এই সম্পর্কে জটিলতা তৈরি হয়, যা সময়মতো সমাধান না হলে মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে।
বাস্তব কেস উদাহরণ
কেস–১: জয়া ও কবির
পারিবারিক পছন্দে বিয়ে হলেও বিয়ের শুরু থেকেই জয়ার মনে হয় কবিরের অন্য কারো সাথে অনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। এই সন্দেহকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে নিয়মিত কলহ শুরু হয়। অন্যদিকে কবির মনে করে জয়া সংসার ও সন্তানের যত্নে উদাসীন এবং প্রায়ই মিথ্যা বলে। জয়ার অভিযোগ, কবির তার উপর অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করে, সামাজিকভাবে অপমান করে এবং তার বাবা-মায়ের কাছে বদনাম করে। পারস্পরিক অবিশ্বাস ও দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব এক পর্যায়ে শারীরিক সহিংসতায় রূপ নেয়।
কেস–২: জেরিন ও জারিফ
বয়সের বড় ব্যবধান ও যৌথ পরিবারে বসবাস এই দাম্পত্যে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। জারিফ প্রায় সব সিদ্ধান্ত জেরিনের উপর চাপিয়ে দেয় এবং অফিস শেষে পরিবারের অন্য সদস্যদের সাথেই সময় কাটায়। জেরিন বারবার বিষয়গুলো জানালেও কোনো পরিবর্তন না দেখে গভীর হতাশায় ভোগে। শেষ পর্যন্ত মানসিক চাপে জেরিন ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে।
কেস–৩: রুনা ও জাহিদ
বিয়ের সাত মাসের মধ্যেই পারস্পরিক প্রত্যাশা ও সময় দেওয়া–নেওয়া নিয়ে মতবিরোধ তীব্র হয়। রুনার অভিযোগ, জাহিদ তাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে না; জাহিদের ধারণা, রুনার প্রত্যাশা অযৌক্তিক। একে অপরকে বুঝতে না পারার অনুভূতি থেকে তারা আলাদা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
দাম্পত্য সমস্যার মনোবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ
প্রতিটি দাম্পত্য সম্পর্কেই মতের অমিল থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু যখন এই মতবিরোধ দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে এবং সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয় না, তখন তা গুরুতর সমস্যায় রূপ নেয়। অনেক ক্ষেত্রে ইগো (Ego), দোষারোপের প্রবণতা এবং পারস্পরিক দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার কারণে সমস্যা আরও জটিল হয়ে ওঠে।
দাম্পত্য কলহের সাধারণ কারণসমূহ
সাধারণত যে বিষয়গুলো নিয়ে দাম্পত্য সম্পর্কে সমস্যা দেখা যায়, সেগুলো হলো—
- একে অপরের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত প্রত্যাশা
- স্বামী-স্ত্রীর ভূমিকা নিয়ে বিভ্রান্তি
- শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন
- ব্যক্তিগত গোপনীয়তায় হস্তক্ষেপ
- যোগাযোগের দুর্বলতা
- শ্বশুরবাড়ি বা যৌথ পরিবারের দ্বন্দ্ব
- ব্যক্তিত্বগত পার্থক্য
- মানসিক অসুস্থতা
- অবিশ্বাস ও সন্দেহ
- যৌন সমস্যা
- পেশাগত ও আর্থিক চাপ
- দায়িত্ব বণ্টনের অসামঞ্জস্য
- হিংসা, নেশা গ্রহণ ও বিনোদন নিয়ে মতভেদ
দাম্পত্য সমস্যায় সাইকোলজিস্টের ভূমিকা
এই ধরনের সমস্যায় মেরিটাল থেরাপি (Marital Therapy) অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে। প্রশিক্ষিত সাইকোলজিস্টরা বৈজ্ঞানিক মনোবৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মাধ্যমে দম্পতিদের মধ্যে বিদ্যমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত ও সমাধানে সহায়তা করেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্বামী ও স্ত্রীকে একসাথে কাউন্সেলিং সেশনে অংশ নিতে হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যক্তিগত সমস্যার জন্য আলাদা থেরাপিস্ট বা কো-থেরাপিস্ট যুক্ত করা হয়।
সুস্থ দাম্পত্য সম্পর্ক বজায় রাখার মনোবৈজ্ঞানিক কৌশল
ভালো বৈবাহিক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে কিছু কার্যকর কৌশল অনুসরণ করা যেতে পারে—
- সমস্যা হলে খোলামেলা ও শান্তভাবে আলোচনা করা
- অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা বারবার সামনে না আনা
- খোঁচামূলক বা অপমানজনক ভাষা পরিহার করা
- নিশ্চিত প্রমাণ ছাড়া সন্দেহ না করা
- একে অপরকে দোষারোপ না করা
- মানসিক সমস্যার ক্ষেত্রে পেশাদার চিকিৎসা নেওয়া
- যৌন সমস্যায় প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া
- একসাথে আনন্দময় সময় কাটানো
- ভালোবাসা প্রকাশে ছোট উপহার ও সৃজনশীল উদ্যোগ নেওয়া
- অতীতের সুখকর স্মৃতি একসাথে স্মরণ করা
- মনোযোগ দিয়ে একে অপরের কথা শোনা
- রাগ, কষ্ট ও ভালো লাগা গোপন না রেখে প্রকাশ করা
- সম্মানজনক আচরণ ও স্নেহপূর্ণ সম্বোধন ব্যবহার করা
- আদেশ না দিয়ে অনুরোধের ভাষা প্রয়োগ করা
- কোনো বিষয়ে সমস্যা হলে প্রসঙ্গের বাইরে না যাওয়া
উপসংহার
দাম্পত্য সমস্যা উপেক্ষা করলে তা সময়ের সাথে আরও জটিল আকার ধারণ করে। তাই যত দ্রুত সম্ভব এই সমস্যাগুলো নিয়ে কাজ করা অত্যন্ত জরুরি। একটি সুস্থ দাম্পত্য সম্পর্ক গড়ে তুলতে স্বামী ও স্ত্রী—উভয়েরই আন্তরিক প্রচেষ্টা, দায়িত্ববোধ এবং প্রয়োজনে পেশাদার মনোবৈজ্ঞানিক সহায়তা গ্রহণ অপরিহার্য।
লেখক: ইশরাত রহমান, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট, ন্যাশনাল ট্রমা কাউন্সেলিং সেন্টার (লেখাটি আংশিক পরিবর্তিত)।
(মুল লেখাটি মনভুবন-২ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল)


