ইতিহাসের পাতায় ১৯৩২ সালটি ছিল মানবসভ্যতার জন্য এক চরম সন্ধিক্ষণ। একদিকে জার্মানিতে অ্যাডলফ হিটলারের নেতৃত্বে নাৎসি বাহিনীর উন্মত্ত উত্থান ঘটছে, ঠিক তখনই পৃথিবীর দুই শ্রেষ্ঠ মস্তিষ্ক— পদার্থবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন এবং মনোবিজ্ঞানী সিগমুন্ড ফ্রয়েড— লিপ্ত ছিলেন এক ঐতিহাসিক পত্রালাপে । তাঁদের আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল এক চিরন্তন ও দহনকারী প্রশ্ন: “মানুষ কেন যুদ্ধ করে?” এবং “মানবজাতিকে যুদ্ধের বিভীষিকা থেকে রক্ষা করার কি কোনো পথ আছে?” ।
আজ এক শতাব্দী পরে এসেও রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের রক্তক্ষয়ী অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে তাঁদের বিশ্লেষণগুলোর অনেক দিক আজও বিস্ময়করভাবে প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়।
পত্রালাপের প্রেক্ষাপট: শান্তি প্রতিষ্ঠার এক বুদ্ধিবৃত্তিক উদ্যোগ
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের নারকীয় ধ্বংসলীলার পর বিশ্বশান্তি বজায় রাখার লক্ষ্যে গঠিত হয়েছিল লিগ অব নেশনস। ১৯৩১-৩২ সালের দিকে এই সংস্থার একটি শাখা বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে মুক্ত আলোচনার আয়োজন করে। সংস্থাটির আমন্ত্রণে আইনস্টাইন তাঁর আলোচনার সঙ্গী হিসেবে বেছে নেন সিগমুন্ড ফ্রয়েডকে। আইনস্টাইনের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, যুদ্ধের প্রকৃত কারণ কেবল রাজনৈতিক সমীকরণে নয়, বরং মানুষের অবচেতন মনের গহীনে লুকিয়ে আছে । ১৯৩৩ সালে তাঁদের এই বিনিময়কৃত চিঠিগুলো “Why War?” নামক একটি পুস্তিকা আকারে প্রকাশিত হয় ।
আইনস্টাইনের উদ্বেগ: শক্তির দাপট ও জনমানসের উন্মাদনা
আইনস্টাইন তাঁর চিঠিতে মূলত তিনটি প্রধান সংকটের কথা তুলে ধরেন:
- সার্বভৌমত্ব বনাম আন্তর্জাতিক আইন: তিনি প্রস্তাব করেন যে, যুদ্ধ এড়াতে রাষ্ট্রগুলোকে একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক আদালতের শাসন মেনে নিতে হবে এবং নিজেদের সার্বভৌমত্বের কিছুটা অংশ ত্যাগ করতে হবে ।
- স্বার্থান্বেষী মহলের প্রভাব: তিনি লক্ষ্য করেন, শাসক গোষ্ঠী এবং অস্ত্র ব্যবসায়ীরা নিজেদের সংকীর্ণ কায়েমী স্বার্থ হাসিলের জন্য সর্বদা শান্তি প্রক্রিয়ায় বাধা হয়ে দাঁড়ায় ।
- মনস্তাত্ত্বিক নিয়ন্ত্রণ: শাসক শ্রেণী কীভাবে সংবাদপত্র ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে যুদ্ধের উন্মাদনা ও ঘৃণার বিষ ছড়িয়ে দেয়, তা নিয়ে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন । তিনি ফ্রয়েডের কাছে জানতে চান, মানুষকে কি এই ‘সামষ্টিক উন্মাদনা’ থেকে মুক্ত করা সম্ভব?
ফ্রয়েডের গভীর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ: মানুষের ভেতরের ‘অন্ধকার‘
আইনস্টাইন যুদ্ধ থামানোর জন্য যে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার (আইন ও আদালত) প্রস্তাব করেছিলেন, ফ্রয়েড নীতিগতভাবে তাকে সমর্থন করলেও একজন মনস্তত্ত্ববিদ হিসেবে তিনি ছিলেন চরম বাস্তববাদী। তিনি মানব চরিত্রের এক জটিল, রূঢ় ও অন্ধকার দিক উন্মোচন করে দেখান যে, যুদ্ধের বীজ কোনো রাজনৈতিক দলিলে নয়, বরং মানুষের অবচেতন মনের গহীনেই প্রোথিত থাকে। তাঁর সেই বিশ্লেষণকে তিনটি মূল স্তম্ভে ভাগ করা যায়:
১. আইন বনাম শক্তি (Right vs. Might): সভ্যতার এক আদিম মুখোশ
ফ্রয়েডের মতে, মানব ইতিহাসের শুরু থেকেই যেকোনো বিরোধ বা দ্বন্দ্ব মেটানোর একমাত্র আদিম হাতিয়ার ছিল পেশিশক্তি বা ‘মাইট’ (Might)।
- আইনের জন্ম: বিবর্তনের এক পর্যায়ে অপেক্ষাকৃত দুর্বল মানুষেরা বুঝতে পারল যে, একাকী তারা শক্তিশালী পশুর মতো মানুষের সাথে পারবে না। তাই অনেক দুর্বল মানুষ একত্রিত হয়ে একটি ‘যৌথ শক্তি’ তৈরি করল। এই যৌথ শক্তির নামই হলো ‘আইন’ বা ‘রাইট’ (Right)। অর্থাৎ, আইন হলো মূলত শক্তিশালীকে দমনের জন্য দুর্বলের জোটবদ্ধ রূপ।
- আন্তর্জাতিক ব্যর্থতা: সভ্য সমাজে ব্যক্তিমানুষ আইনের শাসন মেনে চললেও, বৈশ্বিক রাজনীতিতে বা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আজও কোনো কার্যকর ‘একক কেন্দ্রীয় শক্তি’ বা বিশ্ব-আদালত গড়ে ওঠেনি। ফলে রাষ্ট্রগুলো আইন বা ন্যায়ের কথা মুখে বললেও, স্বার্থের সংঘাত হলেই তারা সেই আদিম হিংস্র পেশিশক্তির (Might) পথেই পা বাড়ায়।
২. দ্বৈত প্রবৃত্তি তত্ত্ব (The Dual Drive Theory: Eros & Thanatos)
ফ্রয়েড মানুষের সামগ্রিক আচরণ ও মানসিকতাকে দুটি মূল চালিকাশক্তি বা প্রবৃত্তির টানাপোড়েন দিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন:
- ইরস (Eros – The Life Instinct): এটি হলো জীবন-প্রবৃত্তি। মানুষের ভেতরের প্রেম, ভালোবাসা, সৃজনশীলতা, সহানুভূতি এবং একে অপরের সাথে জুড়ে থাকার আকুলতাই হলো ‘ইরস’। এটি সমাজকে গড়ে তোলে, মানুষকে টিকিয়ে রাখে।
- থানাটোস (Thanatos – The Death Drive): এটি হলো মৃত্যু বা ধ্বংস-প্রবৃত্তি। ফ্রয়েডের এই তত্ত্বটি সবচেয়ে চমকপ্রদ। তিনি বলেন, মানুষের ভেতরে অবচেতনে নিজের এবং চারপাশের সবকিছুকে ধ্বংস করার একটি সুপ্ত বাসনা থাকে। যখন এই ভেতরের ধ্বংসাত্মক শক্তি বাইরে তীব্রভাবে প্রকাশ পায়, তখনই তা হিংস্রতা, পরশ্রীকাতরতা, আগ্রাসন এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে ‘যুদ্ধ’-এর রূপ নেয়। মানুষের মন থেকে এই ‘থানাটোস’-কে উপড়ে ফেলা কোনোভাবেই সম্ভব নয়; একে বড়জোর সাময়িকভাবে অন্য খাতে ডাইভার্ট বা চালিত করা যায়।
৩. ইউটোপিয়া বা আদর্শবাদের সীমাবদ্ধতা: শান্তিবাদী পৃথিবীর এক অলীক স্বপ্ন
আইনস্টাইনের মতো অনেক বিশ্বনেতাই স্বপ্ন দেখতেন এমন এক পৃথিবীর, যেখানে কোনো যুদ্ধ থাকবে না। কিন্তু ফ্রয়েড এই রোমান্টিক শান্তিবাদ বা আদর্শবাদকে কঠোরভাবে নাকচ করে একে একটি ‘অবাস্তব কল্পনা’ বা ইউটোপিয়া বলে অভিহিত করেন।
- যুগপৎ সহাবস্থান: ফ্রয়েডের মতে, আলো ছাড়া যেমন অন্ধকারের অস্তিত্ব নেই, তেমনি ‘ইরস’ ছাড়া ‘থানাটোস’-এর অস্তিত্ব অসম্ভব। মানুষের মন কোনো পবিত্র সাদা কাগজ নয়; প্রতিটি মানুষের ভেতরেই ‘ভালো’ (সৃষ্টি) এবং ‘মন্দ’ (ধ্বংস) সমান্তরালভাবে অবস্থান করে। তাই মানবজাতিকে শতভাগ অহিংস বা পুরোপুরি শান্তিবাদী করে তোলার চেষ্টা করা আর মানুষের প্রাকৃতিক স্বভাবকে অস্বীকার করা একই কথা। যুদ্ধকে চিরতরে নির্মূল করা যাবে না, কেবল মানবিক সংস্কৃতির মেলবন্ধনে তার প্রকাশকে কিছুটা স্তিমিত করা যেতে পারে।
বর্তমান বিশ্ব: এক শতাব্দী আগের ভবিষ্যদ্বাণীর নির্মম প্রতিফলন
বর্তমান বিশ্ব: এক শতাব্দী আগের ভবিষ্যদ্বাণীর নির্মম প্রতিফলন আজকের আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ও বিশ্বায়িত পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে আমরা যদি চারপাশের চলমান সংঘাতগুলোর দিকে তাকাই, তবে দেখব প্রায় একশ বছর আগে এই দুই মনীষীর করা প্রতিটি বিশ্লেষণ আজ কতটা প্রাসঙ্গিক এবং একই সাথে আতঙ্কজনকভাবে সত্য প্রমাণিত হয়েছে। তাঁদের ভাবনার আলোকে বর্তমান বিশ্বকে নিম্নোক্তভাবে ব্যাখ্যা করা যায়:
১. আধুনিক প্রচারণায় আইনস্টাইনের আশঙ্কার প্রতিফলন
আইনস্টাইন বলেছিলেন, শাসক শ্রেণী মিডিয়া এবং শিক্ষার মাধ্যমে জনগণের মনে ঘৃণার বীজ বুনে দেয়। বর্তমান যুগে আমরা দেখছি সোশ্যাল মিডিয়া, ডিপফেক (Deepfake) প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করে কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হচ্ছে। রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত হোক কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের মানবিক সংকট— যুদ্ধক্ষেত্রের চেয়েও বড় যুদ্ধ চলছে সাইবার স্পেসে, যেখানে সাধারণ মানুষের মনকে নিয়ন্ত্রিত করে যুদ্ধের পক্ষে জনমত তৈরি করা হচ্ছে।
২. আন্তর্জাতিক আইনের ব্যর্থতা ও ফ্রয়েডের ‘মাইট বনাম রাইট‘
আইনস্টাইন প্রস্তাব করেছিলেন, একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক আদালত বা সংস্থা গঠন করা হোক, যার অধীনে সমস্ত রাষ্ট্র নিজেদের সার্বভৌমত্ব কিছুটা ত্যাগ করে শান্তি বজায় রাখবে। ফ্রয়েড তখনই বলেছিলেন, এটি সফল হবে না কারণ শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো কখনোই নিজের ক্ষমতা ত্যাগ করতে চাইবে না। আজ জাতিসংঘ (UN) এবং এর নিরাপত্তা পরিষদের (UN Security Council) স্থবিরতা ফ্রয়েডের সেই যুক্তিরই প্রমাণ। পরাশক্তিগুলো নিজেদের ভেটো ক্ষমতা ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক আইনকে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছে। আইন বা ‘রাইট’ (Right) এখানে পেশিশক্তি বা ‘মাইট’ (Might)-এর কাছে পরাস্ত।
৩. থানাটোস-এর আধুনিক রূপ: পারমাণবিক ও রোবোটিক যুদ্ধজাহাজ
মৃত্যুর আধুনিক কারিগর ফ্রয়েড মানুষের ভেতরের যে সহজাত ধ্বংসাত্মক প্রবৃত্তিকে ‘থানাটোস’ (Thanatos) বলে চিহ্নিত করেছিলেন, আজকের প্রযুক্তি তাকে কয়েকগুণ বেশি সুনিপুণ ও ভয়ংকর করে তুলেছে।
অমানবিক যুদ্ধ: আজ যুদ্ধক্ষেত্রে কেবল মানুষ লড়ছে না; কিলার ড্রোন, হাইপারসনিক মিসাইল এবং এআই চালিত রোবোটিক যুদ্ধজাহাজ যুদ্ধের সংজ্ঞাই বদলে দিচ্ছে।
গণবিধ্বংসী সভ্যতা: ফ্রয়েডের মতে সভ্যতা মানুষকে কিছুটা শান্ত করে। কিন্তু বর্তমান যুগে সভ্যতা মানুষকে নৈতিকভাবে শান্ত করার বদলে কেবল তার ধ্বংস করার ক্ষমতাকে আরও সুদূরপ্রসারী, দূর-নিয়ন্ত্রিত এবং গণবিধ্বংসী করে তুলেছে। পারমাণবিক অস্ত্রের আধুনিকায়ন আজ পুরো মানবজাতিকে এক অবিরাম ‘থানাটোস’-এর হুমকির মুখে দাঁড় করিয়ে রেখেছে।
সমাধানের পথ কি তবে রুদ্ধ?
চিঠিটির সমাপ্তিতে এসে ফ্রয়েড ও আইনস্টাইন—দুজনই এই রূঢ় বাস্তবতাকে মেনে নিয়েছেন যে, মানবজাতিকে রাতারাতি বা সহজে যুদ্ধমুক্ত করা সম্ভব নয়। তবে এই হতাশার অন্ধকারেও তাঁরা চিরতরে পথ হারাননি। মানুষের ধ্বংসাত্মক প্রবৃত্তি বা ‘থানাটোস’-এর বিপরীতে তাঁরা এমন কিছু দীর্ঘমেয়াদী ও কাঠামোগত পরিবর্তনের কথা বলেছেন, যা যুদ্ধ প্রতিরোধের মহৌষধ হিসেবে কাজ করতে পারে:
১. সাংস্কৃতিক বিকাশ ও ‘প্যাসিফিস্ট‘ মনস্তত্ত্ব (Cultural Development)
ফ্রয়েড লক্ষ্য করেছিলেন যে, মানব সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক গঠনেও এক ধরণের বিবর্তন আসে। একে তিনি ‘সাংস্কৃতিক বিকাশ’ বলে অভিহিত করেন।
সহজাত অনীহা: এই সাংস্কৃতিক ও মানসিক বিকাশের ফলেই মানুষ ধীরে ধীরে আদিম পশুর মতো হিংস্রতা ত্যাগ করে সভ্য হয়ে ওঠে।
যুদ্ধের প্রতি শারীরিক ঘৃণা: ফ্রয়েডের আশা ছিল, শিক্ষার আলো এবং সংস্কৃতির সুস্থ চর্চা মানুষের মধ্যে এমন এক উচ্চতর চেতনার জন্ম দেবে, যার ফলে মানুষ যুদ্ধের নাম শুনলেই এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক তীব্র ঘৃণা (Physical & Psychological Repulsion) অনুভব করবে। অর্থাৎ, যুদ্ধ করাটা মানুষের কাছে একসময় অসভ্যতা ও আদিমতা বলে গণ্য হবে।
২. স্বাধীন বৌদ্ধিক নেতৃত্ব (Intellectual Leadership)
আইনস্টাইনের তোলা ‘শাসকশ্রেণীর প্রোপাগান্ডা’ সংকটের জবাবে ফ্রয়েড এক অনন্য সমাধানের কথা বলেন। তিনি রাষ্ট্র বা ধর্মের অধীনে থাকা বুদ্ধিজীবীদের চেয়ে সম্পূর্ণ স্বাধীন একদল চিন্তাবিদের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন।
সত্যের অপোসহীন চর্চা: সমাজে এমন এক বুদ্ধিজীবী বা স্বাধীন চিন্তাশীল শ্রেণী গড়ে তুলতে হবে, যারা কোনো রাজনৈতিক দল, কর্পোরেট অস্ত্র ব্যবসায়ী কিংবা ধর্মীয় উন্মাদনার তোয়াক্কা করবেন না।
জনগণকে পথ দেখানো: এই কায়েমী স্বার্থহীন দূরদর্শী মানুষেরা সাধারণ মানুষকে শাসকের মিথ্যে প্রোপাগান্ডা এবং ‘সামষ্টিক উন্মাদনা’ থেকে মুক্ত করে সত্য, ন্যায় ও শান্তির প্রকৃত পথ দেখাবেন।
৩. সহমর্মিতার শক্তি ও ‘ইরস‘-এর জাগরণ (Emotional Ties & Eros)
ফ্রয়েড মনে করতেন, মানুষের ভেতরের অন্ধ ধ্বংসাত্মক প্রবৃত্তিকে (Thanatos) যদি কোনো কিছু রুখতে পারে, তবে তা হলো জীবন ও ভালোবাসার প্রবৃত্তি—‘ইরস’ (Eros)।
যৌথ স্বার্থ ও আবেগীয় বন্ধন: যুদ্ধ ঠেকাতে মানুষের মধ্যে কেবল আইনের শাসন চাপিয়ে দিলে হবে না, মানুষের সাথে মানুষের সংযোগ বাড়াতে হবে। যখন সমাজে পারস্পরিক সহমর্মিতা, যৌথ স্বার্থের অংশীদারিত্ব এবং বিশ্ব-ভ্রাতৃত্ববোধ তীব্র হবে, তখন মানুষ অন্যের ক্ষতি করাকে নিজের ক্ষতি মনে করবে। ভালোবাসার এই ইতিবাচক আবেগের বন্ধনই মানুষের ভেতরের হিংস্র পশুকে বেঁধে রাখতে পারে।
ইতিহাসের এক ট্র্যাজিক শিক্ষা
আজকের পারমাণবিক ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) যুগে দাঁড়িয়ে তাঁদের এই এক শতাব্দী আগের আলোচনা কেবল একটি ঐতিহাসিক দলিল নয়; বরং মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষার এক চূড়ান্ত সতর্কবার্তা। আমরা যদি আজ ‘ইরস’ বা ভালোবাসার শক্তিতে বলীয়ান হয়ে আমাদের সংস্কৃতির উত্তরণ ঘটাতে না পারি, তবে আমাদের নিজেদের তৈরি প্রযুক্তিই একদিন আমাদের সম্পূর্ণ ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
বিদ্রূপের বিষয় হলো, এই দুই মহান মনীষী যখন একবিংশ শতাব্দীর মানুষের জন্য এই শান্তির রূপরেখা তৈরি করছিলেন, তার মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই মানব ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কিত অধ্যায়—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ—শুরু হয়। নাৎসি নিপীড়নের মুখে আইনস্টাইন জার্মানি থেকে নির্বাসিত জীবন বেছে নেন, আর ফ্রয়েড নাৎসি-অধিকৃত ভিয়েনা ছেড়ে লন্ডনে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।
আজও মানবসভ্যতা একই সংকটের মুখোমুখি— যেখানে আমরা জানি যুদ্ধের ধ্বংসক্ষমতা, তবুও আমাদের ভেতরের সেই ‘থানাটোস’ যেন আমাদের ধ্বংসের কিনারে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
সূত্র:
- UNESCO Courier — Einstein-Freud letters
- Why War? original publication details (1993)
- Freud’s Civilization and Its Discontents
- League of Nations / International Institute of Intellectual Cooperation
- Stockholm International Peace Research Institute (SIPRI) — Recent Military & AI Technology Reports
লেখকঃ প্রফেসর, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।


