আমরা অনেকেই জীবনে বড় বড় লক্ষ্য নির্ধারণ করি, কিন্তু কিছুদিন পরই থমকে যাই। আমরা বলি— “আমি অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু আসলে কপালটা খারাপ” অথবা “আমার বয়সটা যদি আরেকটু কম হতো!” ডেভিড জে. শোয়ার্টজ তাঁর বিখ্যাত বই ‘The Magic of Thinking Big’-এ এই ধরনের মানসিকতাকে একটি রোগের সাথে তুলনা করেছেন, যার নাম ‘এক্সকিউসাইটিস‘ (Excusitis) বা অজুহাত তৈরির রোগ। অনেকে একে চিহ্নিত করেছেন ‘সাফল্যের ঘাতক ব্যাধি’ হিসেবে। ব্যর্থ এবং গড়পড়তা মানুষদের মধ্যে এটি একটি সাধারণ সংক্রামক ব্যাধি। স্টিভ চ্যান্ডলারের মতে, আমরা যখনই আমাদের বয়স, শারীরিক অবস্থা বা পরিবেশকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করাই, তখন আমরা আসলে নিজের অজান্তেই নিজের ভেতরের প্রবল ইচ্ছাশক্তিকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করি।
এই রোগটি এবং তা সারানোর উপায় সম্পর্কে নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. এক্সকিউসাইটিস আসলে কী?
এটি এমন এক মানসিক প্রক্রিয়া যেখানে আমাদের মস্তিষ্ক কোনো ব্যর্থতা বা নিষ্ক্রিয়তাকে জাস্টিফাই করার জন্য যৌক্তিক অজুহাত খুঁজে বের করে। আপনি যত বেশি অজুহাত দেবেন, আপনার অবচেতন মন তত বেশি বিশ্বাস করতে শুরু করবে যে আপনি আসলেই অসহায়। অর্থাৎ এটি সংক্রামক; যত বেশি আপনি অজুহাত দেবেন, আপনার মস্তিষ্ক তত বেশি নতুন নতুন অজুহাত তৈরি করতে পারদর্শী হয়ে উঠবে।
নাহিদআর হৃদয়েরগল্পঃ “একই গ্রাম থেকে উঠে আসা দুই বন্ধু, নাহিদ আর হৃদয়। দুজনেরই স্বপ্ন ছিল নিজের একটি ব্যবসা গড়ার। পাঁচ বছর পর দেখা গেল, নাহিদ আজ একটি সফল স্টার্টআপের মালিক, আর হৃদয় এখনও সেই একই ডেস্ক জবে আটকে আছে। হৃদয় অভিযোগ করে বলল, ‘তোর ভাগ্য ভালো ছিল, তোর বাবা কিছু টাকা দিয়েছিল। আর আমার শরীরটাও মাঝখানে খারাপ হয়ে গেল। ‘নাহিদ হাসল, কারণ হৃদয়ের অজুহাতগুলোর আড়ালে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল নাহিদের সেই দিনগুলো, যখন সে ভাঙা শরীর নিয়ে ১৮ ঘণ্টা কাজ করত আর টাকার অভাবে হেঁটে বাড়ি ফিরত। পার্থক্যটা ভাগ্যে ছিল না, পার্থক্য ছিল হৃদয়ের ‘অজুহাতের রোগে’ আর নাহিদের ‘অজুহাতহীন শ্রমে’।”
২. এক্সকিউসাইটিসের প্রধান ৪টি ধরণ এবং তা সারানোর টোটকা
ক. বুদ্ধির অজুহাত (Intelligence Excusitis): “আমি যথেষ্ট স্মার্ট নই”
সাফল্যের পথে অন্যতম বড় বাধা হলো নিজের বুদ্ধিমত্তা বা আইকিউ (IQ) নিয়ে হীনম্মন্যতা। অনেক মানুষ মনে করেন, তারা জন্মগতভাবে অনেক বেশি স্মার্ট নন কিংবা তাদের একাডেমিক রেজাল্ট ভালো নয় বলে তারা বড় কিছু করতে পারবেন না। এই ‘বুদ্ধির অজুহাত’ তাদের নতুন কোনো চ্যালেঞ্জ নিতে বাধা দেয়।
- বাস্তব সত্য ও দর্শন: ব্যক্তিগত উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ স্টিভ চ্যান্ডলার তাঁর দর্শনে স্পষ্টভাবে বলেছেন— সফল হওয়ার জন্য আপনার বুদ্ধির পরিমাণের চেয়ে সেই বুদ্ধিকে আপনি কীভাবে পরিচালনা করছেন (দৃষ্টিভঙ্গি), তা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চ আইকিউ সম্পন্ন অনেক মানুষ অলসতার কারণে ব্যর্থ হয়, অথচ সাধারণ মেধার একজন মানুষ কেবল সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি আর অদম্য জেদ নিয়ে আকাশচুম্বী সাফল্য পায়।
- সমাধান (মনস্তাত্ত্বিক টিপস):
- ১. নিজের বুদ্ধিকে শ্রদ্ধা করুন: কখনোই নিজেকে “কম বুদ্ধিমান” বলে লেবেল করবেন না। মনে রাখবেন, ১০০ জন উচ্চ বুদ্ধিসম্পন্ন অলস মানুষের চেয়ে ১ জন ইতিবাচক ও পরিশ্রমী মানুষ অনেক বেশি সফল হয়।
- ২. জ্ঞানের চেয়ে প্রয়োগে গুরুত্ব দিন: সফলতার রহস্য ‘কতটা জানেন’ তার মধ্যে নয়, বরং ‘যা জানেন তার কতটুকু প্রয়োগ করছেন’ তার মধ্যে লুকিয়ে আছে। একেই বলা হয় ‘প্রাকটিক্যাল ইন্টেলিজেন্স’।
- ৩. শেখার মানসিকতা (Growth Mindset): বিশ্বাস করুন যে বুদ্ধি কোনো স্থির বিষয় নয়; অনুশীলনের মাধ্যমে একে যেকোনো সময় বাড়ানো সম্ভব। কার্ল আলব্রেখ্ট-এর মতে, আপনার মস্তিষ্ককে যত বেশি সমস্যার সমাধানে ব্যস্ত রাখবেন, আপনার ‘ব্রেইন পাওয়ার’ তত বাড়বে।
খ. স্বাস্থ্যের অজুহাত (Health Excusitis): “শরীরটা বড্ড খারাপ”
“আমার শরীর ভালো নেই”, “মাথাটা ধরেছে” কিংবা “আমার তো অমুক দীর্ঘমেয়াদী রোগ আছে”—এমন হাজারো শারীরিক অজুহাত দিয়ে আমরা অনেক সময় বড় দায়িত্ব বা কাজ এড়িয়ে চলি। মানুষ যখন কোনো চ্যালেঞ্জ নিতে ভয় পায়, তখন সে অবচেতনভাবেই তার শরীরকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে।
- বাস্তবতা ও উদাহরণ: ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, শারীরিক সীমাবদ্ধতা কখনো সাফল্যের পথে বাধা হতে পারে না যদি মানসিক শক্তি অটুট থাকে। উদাহরণস্বরূপ, ফ্র্যাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট পোলিওতে আক্রান্ত হয়ে হুইলচেয়ারে বসেও টানা চারবার আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেশ পরিচালনা করেছেন। ডেভিড শোয়ার্টজ একটি অমোঘ সত্য বলেছেন— “জং ধরে নষ্ট হওয়া লোহার চেয়ে, কাজ করতে করতে ক্ষয়ে যাওয়া লোহা অনেক বেশি মূল্যবান।”
- সমাধান (মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি):
- ১. কৃতজ্ঞতা প্রকাশ: আপনার শরীরের যে অংশটুকু বা যে ইন্দ্রিয়গুলো এখনও সুস্থ ও সচল আছে, তার জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞ থাকুন। সুস্থতার ওপর ফোকাস করলে কর্মস্পৃহা বাড়ে।
- ২. অসুস্থতা নিয়ে চর্চা বন্ধ করুন: আপনার রোগ নিয়ে যত বেশি মানুষের সাথে গল্প করবেন, আপনার মস্তিষ্ক তত বেশি ‘অসুস্থ’ সংকেত পাঠাতে থাকবে। ফলে আপনি সত্যিই আরও দুর্বল বোধ করবেন।
- ৩. জীবনকে উদযাপন করুন: নিজের রোগকে প্রশ্রয় না দিয়ে কাজে ডুবে থাকুন। মনে রাখবেন, ব্যস্ত মানুষের অসুস্থ হওয়ার সময় খুব কম থাকে।
গ. বয়সের অজুহাত (Age Excusitis): “বড্ড দেরি হয়ে গেছে”
এটি একটি দ্বিমুখী রোগ। কেউ ভাবে সে খুব ছোট, কেউ ভাবে সে বড্ড বুড়ো।
- বাস্তবতা: কর্নেল স্যান্ডার্স ৬৫ বছর বয়সে কেএফসি শুরু করেছিলেন। স্টিভ পাভলিনা তাঁর ‘Personal Development for Smart People’ বইয়ে বলেছেন, বর্তমান মুহূর্তটিই হলো একমাত্র সত্য সময়।
- সময়ের আপেক্ষিকতা ও মানসিক তারুণ্য: স্টিভ চ্যান্ডলারের মতে, বয়স কেবল একটি সংখ্যা মাত্র। আমরা যখন বিশ্বাস করি যে “সময় ফুরিয়ে গেছে”, তখন আমাদের মস্তিষ্ক নতুন কোনো উদ্যোগ নিতে অনীহা প্রকাশ করে। একে নিউরোসায়েন্সের ভাষায় বলা হয় ‘মেন্টাল ব্লক’। কিন্তু যখন আপনি বিশ্বাস করেন যে “সময় সবসময় আমার অনুকূলে”, তখন আপনার মস্তিষ্ক তারুণ্যদীপ্ত এনার্জি ফিরে পায়। বিজ্ঞানের ভাষায়, ইতিবাচক মানসিকতা মস্তিষ্কে ‘ডোপামিন’ এবং ‘এন্ডোরফিন’ নিঃসরণ বাড়ায়, যা আপনার কর্মক্ষমতা এবং এনার্জি লেভেলকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
- সমাধান: আপনি কত বছর বেঁচে আছেন তা না গুনে, আপনার হাতে আরও কত সময় বাকি আছে তা চিন্তা করুন। ৮০ বছর বয়সেও যদি কেউ নতুন কিছু শেখে, তবে সে আরও ৫ বছর উৎপাদনশীল থাকতে পারে। অর্থাৎ ‘দেরি হয়ে গেছে’ এই নেতিবাচক বিশ্বাসটি ত্যাগ করুন।
ঘ. ভাগ্যের অজুহাত (Luck Excusitis): “আমার তো ভাগ্যই খারাপ”
ব্যর্থতার দায় এড়ানোর সবচেয়ে সহজ উপায় হলো ভাগ্যের ওপর দোষ চাপানো। অনেকেই ভাবেন সফল ব্যক্তিরা কেবল ‘সঠিক সময়ে সঠিক স্থানে’ ছিলেন বলেই আজ এই অবস্থানে। তারা সফলদের দীর্ঘ পরিশ্রমের চেয়ে তাদের ‘সুযোগ’ বা ‘ভাগ্য’কে বড় করে দেখেন।
- বিজ্ঞান ও দর্শন কী বলে: শিব খেরা তাঁর ‘তুমিও জিতবে’ বইতে এক অমোঘ সত্য বলেছেন— “ভাগ্য হলো প্রস্তুতি এবং সুযোগের মিলনস্থল।” অর্থাৎ, সুযোগ সবার জীবনেই আসে, কিন্তু কেবল প্রস্তুত ব্যক্তিরাই সেই সুযোগকে ভাগ্যে রূপান্তর করতে পারেন। আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘ইন্টারনাল লোকাস অফ কন্ট্রোল’ (Internal Locus of Control)। সফল মানুষেরা বিশ্বাস করেন যে তাদের জীবনের নিয়ন্ত্রণ তাদের নিজেদের হাতে, ভাগ্যের হাতে নয়।
- সমাধান (কার্যকারণের নিয়ম): ভাগ্যের দোহাই না দিয়ে কার্যকারণের নিয়মে (Law of Cause and Effect) বিশ্বাস স্থাপন করুন। মনে রাখবেন, আজকের ফল আপনার অতীতের কাজের ফসল। আপনি যদি ভবিষ্যতের ভাগ্য বদলাতে চান, তবে আজ থেকেই আপনার কাজের ধরণ এবং চিন্তার ধরণ বদলে ফেলুন।
প্রবাদ আছে: “আমি যত বেশি পরিশ্রম করি, ভাগ্য তত বেশি আমার সহায় হয়।” তাই ভাগ্যের জন্য অপেক্ষা না করে প্রস্তুতির ওপর নজর দিন।
✅ আপনি কি এক্সকিউসাইটিসে আক্রান্ত? (চেক-লিস্ট)
- [ ] আপনি কি প্রায়ই বলেন “আজ থাক, কাল শুরু করব”?
- [ ] আপনি কি মনে করেন সফল হওয়ার জন্য আপনার যথেষ্ট বুদ্ধি বা মেধা নেই?
- [ ] আপনি কি নিজের ব্যর্থতার জন্য ভাগ্য বা অন্য কাউকে দায়ী করেন?
- [ ] আপনি কি নিজের বয়সকে নতুন কিছু শেখার পথে বাধা মনে করেন?
- [ ] আপনি কি কাজের চেয়ে কাজ না করার কারণগুলো বেশি ব্যাখ্যা করেন?
(যদি ৩টির বেশি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তবে আপনার এখনই ‘বিলিফ হ্যাকিং’ প্রয়োজন!)
৩. এক্সকিউসাইটিস সারানোর ৩টি জাদুকরী কৌশল
ক) দায়িত্বের ভার নিন (Principle of Power): পাভলিনার মতে, যতক্ষণ আপনি পরিস্থিতি বা ভাগ্যকে দোষ দেবেন, ততক্ষণ আপনার ক্ষমতা অন্যের হাতে। যেদিন বলবেন “এই অবস্থার জন্য আমিই দায়ী”, সেদিনই আপনি এটি বদলানোর ক্ষমতা পাবেন।
খ) ‘কেন নয়‘ থেকে ‘কীভাবে পারব‘: কার্ল আলব্রেখ্ট-এর ‘Brain Power’ থিওরি অনুযায়ী, আপনার মস্তিষ্ককে যখন আপনি কোনো সমস্যা দেন, সে সমাধানের উপায় খোঁজে। অজুহাত দেওয়া মানে মস্তিষ্কের দরজা বন্ধ করে দেওয়া। প্রশ্ন করুন— “এই সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আমি কীভাবে কাজটি করতে পারি?”
গ) ছোট পদক্ষেপে বড় জয়: স্টিভ চ্যান্ডলারের ১০০টি মোটিভেশন পদ্ধতির একটি হলো— কাজ শুরু করা। অজুহাত যখন চেপে ধরবে, তখন ৫ মিনিটের জন্য হলেও কাজটি করতে শুরু করুন। একশন বা কাজ হলো এক্সকিউসাইটিসের সবচেয়ে বড় প্রতিষেধক।
অজুহাত মুক্ত হওয়ার ৫ দিনের চ্যালেঞ্জ
🚀 ৫ দিনের “নো-এক্সকিউজ” চ্যালেঞ্জ!
- ১ম দিন: আজ শরীরের কোনো ছোটখাটো অসুস্থতা নিয়ে কারো কাছে অভিযোগ করবেন না।
- ২য় দিন: কোনো ভুল হলে অন্যের ওপর দোষ না চাপিয়ে নিজের দায়িত্ব স্বীকার করুন।
- ৩য় দিন: “সময় নেই” না বলে, সবচেয়ে কঠিন কাজটি দিয়ে দিন শুরু করুন।
- ৪র্থ দিন: নিজের মেধা নিয়ে কোনো নেতিবাচক কথা বলবেন না; শুধু বলবেন “আমি শিখছি”।
- ৫ম দিন: আপনার একটি পুরনো স্বপ্ন পূরণে অন্তত ১০ মিনিট কাজ করুন, কোনো অজুহাত ছাড়াই।
৪. নিজের অভিজ্ঞতা (ব্যক্তিগত ছোঁয়া)
“ব্যক্তিগতভাবে আমিও একটা সময় এই রোগের শিকার ছিলাম; ভাবতাম ছোট শহর থেকে উঠে আসায় হয়তো বড় সাফল্য আমার জন্য নয়। কিন্তু যেদিন থেকে অজুহাত দেওয়া ছেড়ে নিজের ‘মানসিক পুনর্গঠন’ শুরু করলাম, সেদিন থেকেই আমার সাফল্যের দুয়ার খুলে যেতে শুরু করল।”
পরিশেষে বলা যায়, সাফল্য কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়; এটি একটি মানসিক পরিচ্ছন্নতা। তাই, নিজের মন থেকে অজুহাতের জঞ্জাল সরিয়ে ফেলুন। মনে রাখবেন, পৃথিবী কেবল তাদেরই পুরস্কার দেয় যারা প্রতিকূলতাকে অজুহাত না বানিয়ে জয়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে।
লেখকঃ প্রফেসর, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। ইমেইলঃ [email protected]


