spot_img

কাজের চাপ এবং মানসিক স্বাস্থ্য: মুখ খোলার সময় এখনই

আমরা যখন কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার কথা ভাবি, তখন আমাদের চোখে ভেসে ওঠে কারখানার শ্রমিকের মাথায় সেফটি হেলমেট, কনস্ট্রাকশন সাইটের সেফটি বেল্ট কিংবা ভারী যন্ত্রপাতি সাবধানে ব্যবহারের নিয়ম। কিন্তু বর্তমান আধুনিক কর্মক্ষেত্রে এমন কিছু অদৃশ্য ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা কোনো হেলমেট বা বেল্ট দিয়ে ঠেকানো যায় না। এই ঝুঁকিগুলো সরাসরি আঘাত করে মানুষের মনে, আর তার প্রভাব গিয়ে পড়ে শরীরে। চিকিৎসা ও শ্রমবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় সাইকোসোশ্যাল হ্যাজার্ড (Psychosocial Hazards) বা মানসিক ও সামাজিক ঝুঁকি

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বিশ্বজুড়ে কর্মক্ষেত্রের এই অলক্ষ্যে থাকা সংকটটিকে আমাদের সামনে নিয়ে এসেছে। বর্তমান পরিবর্তনশীল কর্মবিশ্বে এই ঝুঁকিগুলো কেন এখন আর এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই, তা নিয়েই আজকের আলোচনা।

১. পরিসংখ্যান যখন বিপদের ঘণ্টা বাজায়

দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, কাজের অতিরিক্ত চাপ, কর্মক্ষেত্রে মানসিক বা শারীরিক হয়রানি, কম বেতন এবং চাকরির অনিশ্চয়তা প্রভৃতি, এসবই মানসিক ও সামাজিক ঝুঁকির অন্তর্ভুক্ত। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) নতুন প্রতিবেদন ‘The psychosocial working environment: Global developments and pathways for action’ আমাদের চোখ খুলে দেওয়ার মতো কিছু তথ্য সামনে এনেছে।

কর্মক্ষেত্রের এই মানসিক ও সামাজিক ঝুঁকির কারণে বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর ,৪০,০০০-এরও বেশি মানুষ মারা যাচ্ছেন। এই অকাল মৃত্যুর পেছনে মূল কারণ কাজের চাপের ফলে সৃষ্ট হৃদরোগ (Cardiovascular Diseases) এবং মানসিক ব্যাধি। এছাড়া এর ফলে প্রতি বছর প্রায় ৪.৫ কোটি সুস্থ কর্মক্ষম জীবন বছর (DALYs – Disability-Adjusted Life Years) নষ্ট হচ্ছে।

বিশেষ করে এশিয়া এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এই সমস্যা আরও প্রকট। এই অঞ্চলের প্রায় অর্ধেক শ্রমিককে সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টারও বেশি সময় কাজ করতে হয়, যা বিশ্বের অন্য যেকোনো অঞ্চলের চেয়ে অনেক বেশি। দীর্ঘ সময় ধরে এই মানসিক চাপ বয়ে বেড়ানোর ফলে স্ট্রোক এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।

২. ‘সাইকোসোশ্যাল হ্যাজার্ড’ বা মানসিক ঝুঁকি আসলে কী?

সহজ কথায়, কাজের পরিবেশ, কাজের ধরন এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার ত্রুটির কারণে কর্মীদের মনে যে তীব্র মানসিক চাপ ও নেতিবাচক প্রভাব তৈরি হয়, সেটাই সাইকোসোশ্যাল হ্যাজার্ড। এর প্রধান উৎসগুলো নিচে একটি তালিকার মাধ্যমে সহজে বোঝানো হলো:

ঝুঁকির ধরন (Hazards)এর বাস্তব উদাহরণ (Examples)
কাজের অতিরিক্ত চাপঅবাস্তব ডেডলাইন বা টার্গেট, কম কর্মী দিয়ে বেশি কাজ করানো।
দীর্ঘ কর্মঘণ্টাসপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করা, ওভারটাইমের চাপ।
ভূমিকার অস্পষ্টতানিজের দায়িত্ব বা কাজের পরিধি ঠিকঠাক না জানা।
কর্মক্ষেত্রে হয়রানিমানসিক নির্যাতন (Bullying), বৈষম্য বা লিঙ্গভিত্তিক হয়রানি।
চাকরির অনিশ্চয়তাযেকোনো সময় চাকরি চলে যাওয়ার ভয়, কম বেতন।

৩. এশিয়া এবং আধুনিক গিগ ইকোনমি‘: নতুন ফ্রন্টলাইন

প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এই মানসিক ঝুঁকির সবচেয়ে বড় শিকার এশিয়া এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের শ্রমিকরা। এই অঞ্চলের প্রায় অর্ধেক কর্মীকে সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টারও বেশি সময় কাজ করতে হয়, যা বিশ্বের অন্য যেকোনো অঞ্চলের চেয়ে অনেক বেশি।

পাশাপাশি প্রযুক্তির কল্যাণে গড়ে ওঠা আধুনিক কাজের সংস্কৃতি, যেমন—ফ্রিল্যান্সিং, রাইড শেয়ারিং বা ফুড ডেলিভারি অ্যাপের (গিগ ইকোনমি) কর্মীরা এক নতুন সংকটে পড়েছেন। একদিকে যেমন তাদের আয়ের কোনো নিশ্চয়তা নেই, অন্যদিকে অ্যালগরিদমের বেঁধে দেওয়া ‘টার্গেট’ পূরণ করতে গিয়ে তারা দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা মানসিক উত্তেজনার মধ্যে থাকেন। প্রযুক্তির কারণে কর্মক্ষেত্র এখন পকেটের স্মার্টফোনে ঢুকে গেছে, ফলে ‘ব্যক্তিগত জীবন’ আর ‘কাজের জীবন’-এর মধ্যকার সীমারেখা পুরোপুরি মুছে গেছে।

৪. সবচেয়ে বড় বাধা: মুখ খোলার ভয় (Stigma)

কারখানায় কারো হাত কেটে গেলে সে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যায় এবং সহকর্মীরাও তাকে সহানুভূতি দেখায়। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে কেউ যখন প্রচণ্ড মানসিক চাপ, বিষণ্ণতা (Depression) বা তীব্র ক্লান্তি (Burnout)-এর মধ্য দিয়ে যান, তখন তিনি মুখ খুলতে ভয় পান।

আমাদের সমাজে এখনও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে এক ধরনের ট্যাবূ বা লোকলজ্জা রয়েছে। কর্মীরা মনে করেন, মানসিক সমস্যার কথা প্রকাশ করলে তাকে ‘দুর্বল’ ভাবা হবে, পদোন্নতি আটকে যাবে কিংবা চাকরিটাই চলে যেতে পারে। এই নীরবতার সংস্কৃতি সমস্যাটিকে আরও জটিল করে তুলছে।

৫. উত্তরণের পথ: গ্লোবাল মডেল এবং আমাদের করণীয়

আইএলও (ILO) স্পষ্ট জানিয়েছে, এই ঝুঁকিগুলো কিন্তু শতভাগ প্রতিরোধযোগ্য। কর্মপরিবেশে কিছুটা মানবিক ও কাঠামোগত পরিবর্তন আনলেই এই পরিস্থিতির উন্নয়ন সম্ভব। বিশ্বের বেশ কিছু দেশ ইতিমধ্যে চমৎকার কিছু উদ্যোগ নিয়েছে:

  • সিঙ্গাপুর: তারা ‘iWorkHealth’ নামক একটি বিশেষ ডিজিটাল টুল ব্যবহার করছে, যার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থা ও ঝুঁকির মাত্রা মূল্যায়ন করতে পারে।
  • অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড: তাদের জাতীয় কর্মক্ষেত্র নিরাপত্তা কৌশলের (National OSH Strategy) মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে বাধ্যতামূলক করেছে।
  • মালয়েশিয়া ও ফিলিপাইন: কর্মক্ষেত্রের মানসিক ক্ষতি রোধে তাদের শ্রম আইনকে আরও শক্তিশালী করছে।

একটি সুস্থ কর্মপরিবেশ তৈরিতে ৩টি জরুরি পদক্ষেপ:

১. রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ: সরকারকে কেবল শারীরিক নিরাপত্তা নয়, বরং কর্মক্ষেত্রের মানসিক সুরক্ষায় সুনির্দিষ্ট আইন ও নীতিমালা তৈরি করতে হবে।

২. নিয়োগকর্তার মানসিকতার পরিবর্তন: মালিকপক্ষকে বুঝতে হবে—সুস্থ কর্মী মানেই উন্নত উৎপাদনশীলতা। কাজের সময় সুনির্দিষ্ট করা, কর্মীদের কাজের স্বীকৃতি দেওয়া এবং হয়রানিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রতিষ্ঠানেরই দায়িত্ব।

3. সামাজিক সংলাপ (Social Dialogue): মালিক, শ্রমিক এবং মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নিয়মিত আলোচনা ও সচেতনতামূলক কর্মশালার আয়োজন করতে হবে।

শেষ কথা

দিনের শেষে, কোনো পরিসংখ্যানই কেবল একটি সংখ্যা নয়। সাড়ে আট লাখ মৃত্যুর প্রতিটি সংখ্যার পেছনে জড়িয়ে আছে একজন মানুষের স্বপ্ন, একটি পরিবার এবং তাদের বেঁচে থাকার লড়াই। কাজের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করা, জীবন কেড়ে নেওয়া নয়।

আধুনিক এই পরিবর্তনশীল বিশ্বে আমরা যদি এখনই কর্মক্ষেত্রের মানসিক ও সামাজিক ঝুঁকিগুলো চিহ্নিত করে ব্যবস্থা না নিই, তবে এক সময় হয়তো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আসবে, কিন্তু তা উপভোগ করার মতো সুস্থ মানুষ থাকবে না। এখনই সময় কর্মক্ষেত্রকে আরও মানবিক ও নিরাপদ করার।

তথ্যসূত্র :

  • International Labour Organization (ILO). (2026). The psychosocial working environment: Global developments and pathways for action. Geneva: ILO.
  • MSN News. (2026). It’s time to address psychosocial hazards in a changing world of work. Source Link

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

0FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles