সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবি বা স্ট্যাটাস দেওয়ার পর অনেকেই বারবার দেখেন—কতজন “লাইক” দিল, কে মন্তব্য করল। এটি আজকের ডিজিটাল জীবনের স্বাভাবিক অংশ। তবে এই ডিজিটাল প্রতিক্রিয়া সবার ওপর সমানভাবে প্রভাব ফেলে না। সাম্প্রতিক একটি আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বিষণ্নতায় (Depression) আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়ার ‘লাইক’ অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি আচরণগত প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে। গবেষকদের মতে, এটি শুধু অনলাইন ব্যবহারের একটি বৈশিষ্ট্য নয়; বরং মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে সামাজিক স্বীকৃতির জটিল সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
এই বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি Psychology Today-এ প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধে আলোচিত হয়েছে JAMA Psychiatry-এ প্রকাশিত নতুন গবেষণার ফলাফল। গবেষণাটি বিষণ্নতা, সামাজিক স্বীকৃতি এবং অনলাইন আচরণের মধ্যে একটি নতুন সম্পর্ক তুলে ধরেছে, যা মানসিক স্বাস্থ্য গবেষণায় নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ
মনোবিজ্ঞানে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রতিষ্ঠিত ধারণা হলো, বিষণ্নতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে Anhedonia বা আনন্দ অনুভবের ক্ষমতা কমে যায়। অর্থাৎ, সাধারণ মানুষ যে বিষয়গুলো থেকে আনন্দ পান, বিষণ্নতায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা সেগুলো থেকে তুলনামূলক কম আনন্দ অনুভব করেন।
এই ধারণা থেকেই গবেষকদের প্রত্যাশা ছিল, সোশ্যাল মিডিয়ার ‘লাইক’ বা ইতিবাচক প্রতিক্রিয়াও তাদের ওপর তুলনামূলক কম প্রভাব ফেলবে। কিন্তু নতুন গবেষণার ফলাফল সেই ধারণার সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়নি।
কীভাবে পরিচালিত হয় গবেষণা?
গবেষণায় বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের ৭,৭৩৬ জন সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীর ১ কোটি ৭০ লাখেরও বেশি পোস্ট বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষকরা পর্যবেক্ষণ করেন, কোনো ব্যক্তি একদিন বেশি সংখ্যক ‘লাইক’ পাওয়ার পর পরবর্তী দিনে তার পোস্ট করার প্রবণতা কতটা পরিবর্তিত হয়।
এই পরিবর্তনকে গবেষকরা reinforcement effect বা ইতিবাচক প্রতিক্রিয়াজনিত আচরণগত শক্তিবৃদ্ধি হিসেবে মূল্যায়ন করেন।
ফলাফলে দেখা যায়, বিষণ্নতায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা অন্যদের তুলনায় ‘লাইক’ পাওয়ার পর আরও বেশি পোস্ট করার প্রবণতা দেখিয়েছেন। অর্থাৎ, ‘লাইক’ তাদের ভবিষ্যৎ আচরণকে তুলনামূলক বেশি প্রভাবিত করেছে।
আনন্দ কম, কিন্তু প্রভাব বেশি
প্রথম দৃষ্টিতে এই ফলাফল কিছুটা বৈপরীত্যপূর্ণ মনে হতে পারে। কারণ, যদি বিষণ্নতায় আনন্দ অনুভব কমে যায়, তাহলে ‘লাইক’ কেন বেশি প্রভাব ফেলবে?
গবেষকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এখানে দুটি ভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া কাজ করে।
প্রথমটি হলো তাৎক্ষণিক আনন্দ (consummatory reward)—অর্থাৎ ‘লাইক’ পেয়ে একজন ব্যক্তি কতটা ভালো অনুভব করেন।
দ্বিতীয়টি হলো আচরণগত শক্তিবৃদ্ধি (motivational reinforcement)—অর্থাৎ সেই ‘লাইক’ ভবিষ্যতে আবার পোস্ট করতে কতটা উৎসাহিত করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বিষণ্নতায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা হয়তো ‘লাইক’ পেয়ে খুব বেশি আনন্দ অনুভব করেন না, কিন্তু সেই ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া তাদের ভবিষ্যৎ আচরণে তুলনামূলক বেশি প্রভাব ফেলে।
কেন এমন হতে পারে?
গবেষকরা সম্ভাব্য কয়েকটি ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন।
বাস্তব জীবনে যদি কেউ পর্যাপ্ত সামাজিক সমর্থন, স্বীকৃতি বা ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া না পান, তাহলে তিনি অনলাইন স্বীকৃতির ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারেন।
এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ‘লাইক’ অনেকের কাছে ক্ষুদ্র হলেও তাৎপর্যপূর্ণ সামাজিক পুরস্কার হিসেবে কাজ করে। এই পুরস্কার মস্তিষ্কে এমন একটি আচরণগত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে, যা মানুষকে আরও বেশি কনটেন্ট প্রকাশে উৎসাহিত করে।
গবেষকদের মতে, বিষণ্নতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়াটি তুলনামূলকভাবে আরও শক্তিশালী হতে পারে।
উদ্বেগের ক্ষেত্রেও কি একই চিত্র?
গবেষণায় শুধু বিষণ্নতা নয়, উদ্বেগ (Anxiety) এবং Compulsivity-সহ অন্যান্য মানসিক বৈশিষ্ট্যও বিশ্লেষণ করা হয়।
ফলাফলে দেখা যায়, ‘লাইক’-এর শক্তিশালী reinforcement effect প্রধানত বিষণ্নতার সঙ্গেই সম্পর্কিত। শুধুমাত্র উদ্বেগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে একই মাত্রার প্রভাব দেখা যায়নি।
এটি ইঙ্গিত করে যে, বিভিন্ন মানসিক সমস্যার ক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব এক রকম নয় এবং প্রতিটি অবস্থার জন্য আলাদা মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে কেন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই গবেষণা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ‘লাইক’ কেবল একটি সংখ্যা নয়। এটি মানুষের আচরণ, আত্মমূল্যায়ন এবং সামাজিক সংযুক্তির অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
বিশেষ করে যারা বিষণ্নতায় ভুগছেন, তাদের জন্য অনলাইন স্বীকৃতি কখনও কখনও বাস্তব জীবনের সামাজিক সমর্থনের বিকল্প হিসেবে কাজ করতে শুরু করতে পারে। ফলে ধীরে ধীরে তারা ডিজিটাল প্রতিক্রিয়ার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকতে পারেন।
তবে গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, এর অর্থ এই নয় যে সোশ্যাল মিডিয়া নিজেই বিষণ্নতার কারণ। বরং এটি একটি জটিল পারস্পরিক সম্পর্ক, যেখানে ব্যক্তির মানসিক অবস্থা এবং অনলাইন অভিজ্ঞতা একে অপরকে প্রভাবিত করতে পারে।
গবেষণার সীমাবদ্ধতা
গবেষণাটি পর্যবেক্ষণভিত্তিক (observational) হওয়ায় এটি কারণ-ফল সম্পর্ক নিশ্চিত করতে পারে না। অর্থাৎ, এটি প্রমাণ করে না যে বিষণ্নতা মানুষকে ‘লাইক’-এর প্রতি বেশি সংবেদনশীল করে তোলে, কিংবা ‘লাইক’-এর ওপর নির্ভরশীলতা থেকেই বিষণ্নতা তৈরি হয়।
গবেষকদের মতে, এই সম্পর্কের প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করতে ভবিষ্যতে দীর্ঘমেয়াদি (longitudinal) এবং পরীক্ষামূলক (experimental) গবেষণা প্রয়োজন।
সচেতনতার বার্তা
মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের যোগাযোগ, শিক্ষা ও আত্মপ্রকাশের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে। কিন্ত, ব্যক্তিগত আত্মমর্যাদা বা মানসিক সুস্থতার একমাত্র উৎস হওয়া উচিত নয়।
যদি কেউ লক্ষ্য করেন যে, নিজের ভালো লাগা বা আত্মবিশ্বাস ক্রমশ অনলাইন ‘লাইক’, মন্তব্য বা অনুসারীর সংখ্যার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। অথবা দীর্ঘদিন ধরে বিষণ্নতা, হতাশা বা আগ্রহহীনতার মতো উপসর্গ অনুভব করছেন। তাহলে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা সাইকোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন এই গবেষণা মনে করিয়ে দেয়, ডিজিটাল যুগে একটি ছোট্ট ‘লাইক’ কখনও কখনও কেবল একটি ক্লিক নয়; এটি মানুষের মানসিক অবস্থা, সামাজিক স্বীকৃতির চাহিদা এবং ভবিষ্যৎ আচরণের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত একটি মনস্তাত্ত্বিক সংকেতও হতে পারে।


