ভূমিকা: আমরা প্রায়ই একটা কথা শুনি— “৫০ বছর পার হওয়ার পর শরীর ও মন আর আগের মতো থাকে না।” কিন্তু কেন এমনটা হয়? এটি কি কেবলই আমাদের মানসিক ধারণা, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে কোনো গভীর বৈজ্ঞানিক সত্য?
সম্প্রতি ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় (UC San Diego এবং UC Irvine) এর একদল গবেষকের করা একটি যুগান্তকারী গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্স‘ (Science)-এ প্রকাশিত এই গবেষণাপত্রটি আমাদের মস্তিষ্কের কোষের বার্ধক্য নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
মস্তিষ্কের নিজস্ব পাহারাদার: মাইক্রোগ্লিয়া (Microglia) এবং তাদের বিদায়
আমাদের মস্তিষ্কে ‘মাইক্রোগ্লিয়া‘ নামক এক বিশেষ ধরনের ইমিউন কোষ বা রোগ প্রতিরোধক কোষ থাকে। এরা মূলত মস্তিষ্কের সুরক্ষায় নিবেদিত পাহারাদারের মতো কাজ করে। জন্মের আগে থেকেই এরা মস্তিষ্কে অবস্থান নেয় এবং সারাজীবন মস্তিষ্ককে রক্ষা করে। কিন্তু গবেষকরা দেখেছেন, বয়স যখন ৫০-এর কোঠা পার হয়, তখন এই মাইক্রোগ্লিয়া কোষগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে শুরু করে।
পাহারাদার যখন বদলে যায়
আসল পাহারাদাররা যখন বিদায় নেয়, তখন তাদের জায়গা দখল করে রক্তনালীতে ঘুরে বেড়ানো অন্য এক ধরনের কোষ (Monocyte-derived cells)। আশ্চর্যের বিষয় হলো, মানুষের বয়স যখন ৭০-এর শেষ ভাগে পৌঁছায়, তখন মস্তিষ্কের আদি ইমিউন কোষগুলো প্রায় পুরোপুরি বিলীন হয়ে যায় এবং এই নতুন আসা রক্তকোষগুলো মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণ নেয়।
সমস্যাটা কোথায়?
নতুন আসা এই কোষগুলো মস্তিষ্কের আদি কোষগুলোর তুলনায় অনেক বেশি সংবেদনশীল। এরা মস্তিষ্কে অতিরিক্ত প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন (Inflammation) সৃষ্টিকারী উপাদান তৈরি করে। আর এই অতিরিক্ত প্রদাহই মূলত মস্তিষ্কের বার্ধক্য বা এজিং (Brain Aging) প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। ফলে আমাদের স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ এবং মানসিক দ্রুততায় প্রভাব পড়ে।
অ্যাস্ট্রোসাইট হ্রাস ও শক্তির অভাব
মস্তিষ্কের বার্ধক্যের পেছনে আরও একটি বড় কারণ হলো ‘অ্যাস্ট্রোসাইট‘ (Astrocytes) নামক কোষের সংখ্যা কমে যাওয়া। এই কোষগুলো নিউরনের মধ্যে সঠিক যোগাযোগ স্থাপন করতে এবং ‘ব্লাড-ব্রেইন ব্যারিয়ার’ বা মস্তিষ্কের বাইরের সুরক্ষাবলয় অটুট রাখতে সাহায্য করে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে এদের সংখ্যা কমতে থাকে। এর পাশাপাশি কোষের পাওয়ার হাউস খ্যাত ‘মাইটোকন্ড্রিয়া’র কর্মক্ষমতাও কমে যায়, ফলে মস্তিষ্কের কোষগুলো কাজ করার জন্য পর্যাপ্ত শক্তি পায় না।
আলগা হয়ে যায় ডিএনএ-এর বাঁধন!
৫০ বছরের পর মস্তিষ্কের আরও একটি বড় পরিবর্তন ঘটে এর জেনেটিক বা ডিএনএ কাঠামোতে। আমাদের শরীরের ডিএনএ এলোমেলোভাবে থাকে না; এটি একটি গোছানো ড্রয়ারের মতো সুন্দরভাবে ভাঁজ করা থাকে। কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই সুসংগঠিত কাঠামোটি ক্রমশ আলগা হতে থাকে। ফলে মস্তিষ্কের প্রয়োজনীয় জিনগুলোর কার্যকারিতা নিয়ন্ত্রণ করা অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়ে।
কীভাবে এই রহস্য উদঘাটন করলেন বিজ্ঞানীরা?
বিজ্ঞানীদের জন্য মানুষের জীবন্ত মস্তিষ্কের ভেতরে কোষের স্তরে উঁকি দেওয়া একরকম অসম্ভব। তাই ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গবেষক দল নির্ভর করেছেন বিজ্ঞানের প্রতি নিবেদিত প্রাণ কিছু মানুষের ওপর, যারা গবেষণার স্বার্থে মৃত্যুর পর নিজেদের মস্তিষ্ক দান করে গেছেন। গবেষকরা ২০ থেকে ১০০ বছর বয়সী ৪০ জন মানুষের মস্তিষ্ক নিয়ে কাজ করেছেন। ২০ থেকে ১০০ বছর বয়সের এই বিশাল পরিসর বিজ্ঞানীদের সামনে মানুষের পুরো জীবনের মস্তিষ্কের পরিবর্তনের একটি সুস্পষ্ট টাইমলাইন বা মানচিত্র তুলে ধরেছে।
তাদের এই গবেষণার মূল লক্ষ্যবস্তু ছিল মস্তিষ্কের অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ— ‘হিপোক্যাম্পাস’ (Hippocampus)। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় হিপোক্যাম্পাস হলো আমাদের স্মৃতি, শিখন (learning) এবং আবেগের মূল কেন্দ্রবিন্দু। বয়স বাড়লে, স্মৃতিভ্রংশ বা অ্যালজেইমার্সের (Alzheimer’s) মতো রোগে সবচেয়ে আগে এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় মস্তিষ্কের এই অংশটিই।
যুগান্তকারী প্রযুক্তির ব্যবহার: আগের গবেষণাগুলোতে সাধারণত পুরো মস্তিষ্কের টিস্যু একসাথে মিশিয়ে বা ব্লেন্ড করে পরীক্ষা করা হতো। এটি ছিল অনেকটা মিক্সড ফ্রুট জুস খেয়ে আলাদা আলাদা ফলের স্বাদ বোঝার চেষ্টা করার মতো! কিন্তু এবার বিজ্ঞানীরা একটি অত্যাধুনিক ও যুগান্তকারী প্রযুক্তির আশ্রয় নেন, যার নাম “সিঙ্গেল-সেল ডিএনএ মিথাইলেশন অ্যানালাইসিস” (Single-cell DNA methylation analysis)।
এই পদ্ধতিতে বিজ্ঞানীরা মস্তিষ্কের লক্ষ লক্ষ কোষ একসাথে না দেখে, অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে প্রতিটি কোষকে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে স্ক্যান করেছেন। বিজ্ঞানীরা মূলত দেখতে চেয়েছেন, বয়স বাড়ার সাথে সাথে প্রতিটি একক কোষের ডিএনএ-তে থাকা ‘এপিজেনেটিক সুইচ’ (যা আমাদের জিনগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে) কীভাবে কাজ করে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) ম্যাজিক: যেহেতু প্রতিটি কোষ থেকে পাওয়া ডেটা বা তথ্যের পরিমাণ ছিল বিশাল এবং মানব-মস্তিষ্কের জন্য তা অত্যন্ত জটিল, তাই এগুলো ম্যানুয়ালি বিশ্লেষণ করা ছিল প্রায় অসম্ভব। এই পাহাড়সম ডেটার জট খুলতে বিজ্ঞানীরা ব্যবহার করেছেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) বা মেশিন লার্নিং প্রযুক্তি।
এআই-এর উন্নত অ্যালগরিদম অত্যন্ত নিখুঁতভাবে প্যাটার্নগুলো খুঁজে বের করেছে। এআই-এর সাহায্যেই বিজ্ঞানীরা স্পষ্টভাবে দেখতে পান কীভাবে ৫০ বছর বয়সের পর আদি মাইক্রোগ্লিয়া কোষগুলো হারিয়ে যায়, ডিএনএ-এর বাঁধন আলগা হতে থাকে এবং বাইরের রক্তকোষ এসে মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করে।
শেষ কথা
বয়স বাড়ার সাথে সাথে মস্তিষ্কের এই পরিবর্তনগুলো প্রাকৃতিক। তবে এই গবেষণাটি ভবিষ্যতে বয়সজনিত রোগ, যেমন অ্যালজেইমার্স বা ডিমেনশিয়া (স্মৃতিভ্রংশ) প্রতিরোধে নতুন চিকিৎসার পথ খুলে দিতে পারে। যেহেতু ৫০ পেরোনোর পর মস্তিষ্ক তার আদি পাহারাদারদের হারায়, তাই এই সময়ে মস্তিষ্কের সঠিক যত্ন নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, পরিমিত ঘুম, নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম এবং নতুন কিছু শেখার মাধ্যমে মানসিক সক্রিয়তা বজায় রাখলে মস্তিষ্কের এই বার্ধক্যের গতি অনেকটাই ধীর করা সম্ভব।
তথ্যসূত্র: https://www.science.org/doi/10.1126/science.adt8307


