spot_img

পড়ার টেবিলে অনীহা? সন্তানের পড়াশোনায় আগ্রহ ফেরানোর ৫টি কার্যকর উপায়

বয়ঃসন্ধিকাল বা অ্যাডোলেসেন্স (Adolescence) সময়টা এক বিশাল পরিবর্তনের সময়। বিশেষ করে ১০ থেকে ২০ বছর বয়স পর্যন্ত কিশোর-কিশোরীদের মস্তিষ্কের গঠন ও আবেগে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। এই সময় অনেক মা-বাবাই অভিযোগ করেন যে, তাদের সন্তান আগে মনোযোগী থাকলেও এখন বই নিয়ে বসতে চায় না। আপনার ১৪ বছর বয়সী মেয়ের ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটা অস্বাভাবিক নয়।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, কেবল শাসন দিয়ে নয়, বরং কিছু বৈজ্ঞানিক কৌশল অবলম্বন করে আমরা তাদের পড়াশোনায় ফিরিয়ে আনতে পারি। নিচে এমন ৫টি কার্যকর উপায় আলোচনা করা হলো:

১. ‘অথোরিটেটিভ’ (Authoritative) অভিভাবকত্ব চর্চা করুন

বিকাশ মনোবিজ্ঞানের ডায়ানা বাউমরিন্ডের (Diana Baumrind) গবেষণা অনুযায়ী, কিশোর বয়সের সন্তানদের জন্য উষ্ণতা (Warmth) এবং কাঠামো বা শাসনের (Structure) সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখা সবচেয়ে জরুরি। একে বলা হয় ‘অথোরিটেটিভ প্যারেন্টিং’।

  • উষ্ণতা: সন্তানের প্রতি ভালোবাসা ও সমর্থন প্রকাশ করুন, তার কথা মন দিয়ে শুনুন।
  • নিয়মানুবর্তিতা (Structure): পড়াশোনার বিষয়ে স্পষ্ট নিয়ম ও প্রত্যাশা বজায় রাখুন। একে অনেকটা উড়োজাহাজ চালানোর সাথে তুলনা করা যায়—পাইলট হিসেবে আপনি যেমন যাত্রীদের (সন্তান) ভয় বা অস্থিরতাকে গুরুত্ব দেবেন (উষ্ণতা, আবার নিরাপত্তার জন্য নিয়ম মেনে সিটবেল্ট বাঁধতেও বাধ্য করবেন (কাঠামো)।

২. স্বায়ত্তশাসন বা নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দিন

মনোবিজ্ঞানী রায়ান এবং ডেসির (Ryan & Deci) Self-Determination Theory অনুযায়ী, মানুষের সহজাত অনুপ্রেরণা (Intrinsic Motivation) তিনটি ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত: স্বায়ত্তশাসন (Autonomy), সক্ষমতা (Competence), এবং আত্মিক সম্পর্ক (Relatedness)। ১৪ বছর বয়সী কিশোরীরা নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলতে চায় এবং তারা চায় তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হোক। তাকে জোর করে পড়তে বসানোর বদলে তাকে নিজের লক্ষ্য নিজে সেট করার স্বাধীনতা দিন।

  • তাকে জিজ্ঞেস করুন, “তুমি তোমার পড়ার রুটিনটা কীভাবে সাজাতে চাও?” ।
  • যখন তারা অনুভব করে যে তাদের সক্ষম ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে এবং তাদের পছন্দের গুরুত্ব আছে, তখন তারা কাজে বেশি অনুপ্রাণিত হয়।

৩. ইতিবাচক উৎসাহ প্রদান (Positive Reinforcement)

মনোবিজ্ঞানের ‘অপারেন্ট কন্ডিশনিং’ (Operant Conditioning) তত্ত্ব অনুযায়ী, কোনো কাজের পর যদি ভালো ফল বা প্রশংসা পাওয়া যায়, তবে সেই কাজটি পুনরায় করার আগ্রহ বাড়ে।

  • সন্তান যখন নিজে থেকে সামান্য সময়ের জন্যও পড়তে বসে, তখন তার সেই প্রচেষ্টার নির্দিষ্টভাবে প্রশংসা করুন। যেমন— “তুমি নিজে থেকে আজ অঙ্কগুলো শেষ করেছ দেখে আমার খুব ভালো লাগছে”।
  • বকাঝকার পরিবর্তে ইতিবাচক স্বীকৃতি মস্তিষ্ক থেকে ডোপামিন (Dopamine) নিঃসরণ বৃদ্ধি করে, যা দীর্ঘমেয়াদে স্বতঃস্ফূর্ত পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলে।

৪. পড়াশোনার সাথে জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য যুক্ত করুন

মনোবিজ্ঞানী এরিক এরিকসনের (Erik Erikson) তত্ত্বানুসারে, বয়ঃসন্ধিকাল হলো ‘Identity vs. Role Confusion’-এর সময়। এই সময় শিক্ষার্থীরা যদি পড়াশোনাকে শুধুই পরীক্ষায় পাশের মাধ্যম মনে করে, তবে তাদের মধ্যে একঘেয়েমি তৈরি হয়। এক্ষেত্রে তাকে পড়াশোনার বাইরেও তার একাডেমিক ও সামাজিক আগ্রহগুলো খুঁজে পেতে সাহায্য করুন।

  • সে যদি নিজেকে একজন পরিশ্রমী শিক্ষার্থী হিসেবে কল্পনা করতে শেখে (Identity formation), তখন তার নিউরো-সার্কিট স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই অনুযায়ী আচরণ পরিচালিত করে। ফলে সে নিজে থেকেই পড়ার টেবিলে বসবে।
  • তাকে বোঝান যে পড়াশোনা কেবল ডিগ্রির জন্য নয়, বরং তার জীবনের লক্ষ্য, পছন্দের কোনো বিষয়ে জ্ঞান অর্জন বা ভবিষ্যতে নিজের একটি অবস্থান তৈরির মাধ্যম।

৫. আবেগকে স্বীকৃতি দিন এবং খোলামেলা কথা বলুন

বয়ঃসন্ধিকালে মস্তিষ্কের আবেগের কেন্দ্র অ্যামিগডালা‘ (Amygdala) অধিক সক্রিয় থাকে, যার ফলে আবেগীয় প্রতিক্রিয়া তীব্র হয়। পড়ার প্রতি তার এই অনীহার পেছনে কোনো মানসিক চাপ, স্কুল বা বন্ধুদের সাথে কোনো সমস্যা, অথবা অন্য কোনো ভয় কাজ করছে কি না তা বোঝার চেষ্টা করুন।

  • পড়াশোনা নিয়ে তার অনুভূতিগুলোকে ‘লেবেল’ করতে শেখান (যেমন— “আমি বুঝতে পারছি তোমার ইতিহাস বিষয়টি বেশ কঠিন লাগছে”)।
  • যখন সন্তান অনুভব করে যে মা-বাবা তার কথা শুনছেন ও বুঝছেন, তখন তার মানসিক চাপ কমে এবং পড়াশোনায় মনোযোগী হওয়া সহজ হয়।

শেষ কথা: মনে রাখবেন, প্রতিটি সন্তানের শিখতে পারার ক্ষমতা ও আগ্রহের জায়গা ভিন্ন। পড়াশোনা বা যেকোনো সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে আমাদের মনে রাখা উচিত যে, সমাধান একদিনে আসবে না। অভিভাবক হিসেবে আপনার ধৈর্য, ভালোবাসা এবং সঠিক কাঠামোর সমন্বয়ই পারে আপনার সন্তানের ভবিষ্যৎকে সুন্দর করে তুলতে।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

0FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles