spot_img

গাড়ি চালানোর ভয়: কারণ ও সমাধান

বিকেল বেলা ঢাকার মহাখালী ফ্লাইওভারের ওপর তীব্র যানজট। চারপাশ থেকে একটানা বাসের হাইড্রোলিক হর্ন আর হুটহাট লেন বদলে ফেলা বাইকের বিকট শব্দ। এর মাঝেই স্টিয়ারিং হাতে বসে আছেন সিয়াম (ছদ্মনাম)। গাড়ির এসি ৩-এ চালানো, অথচ তাঁর কপাল বেয়ে ঝরছে ঘাম, হাত-পা বরফের মতো ঠান্ডা আর বুক এমনভাবে ধড়ফড় করছে যেন এখনই হৃদযন্ত্র বন্ধ হয়ে যাবে। সিয়ামের মনে হচ্ছে— এখনই তিনি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সামনের বাসটিকে সজোরে ধাক্কা দেবেন!

অথচ সিয়াম লাইসেন্সধারী একজন চালক, ড্রাইভিং ভালোবাসতেনও বেশ। কিন্তু মাস ছয়েক আগে চোখের সামনে একটি ভয়াবহ বাস দুর্ঘটনা দেখার পর থেকে এমনটা ঘটছে।

আপাতদৃষ্টিতে সিয়ামকে হয়তো একজন ‘ভীরু’ বা ‘দুর্বল হৃদয়ের মানুষ’ বলে মনে হতে পারে। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি পুরোপুরি আলাদা। সিয়াম একা নন; জনসচেতনতা সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, বিশ্বের প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার প্রায় ৬% থেকে ১২% মানুষ জীবনে কোনো না কোনো সময় গাড়ি চালানো বা যানবাহনে ভ্রমণের ক্ষেত্রে তীব্র ভীতিতে ভোগেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই অদৃশ্য এবং অবহেলিত মানসিক ব্যাধিটির নাম অ্যাম্যাক্সোফোবিয়া‘ (Amaxophobia)

অ্যাম্যাক্সোফোবিয়া আসলে কী?

‘অ্যাম্যাক্সোফোবিয়া’ (Amaxophobia) শব্দটির উৎপত্তি গ্রিক শব্দ ‘Amaxa’ (যার অর্থ যানবাহন) এবং ‘Phobia’ (যার অর্থ ভীতি) থেকে। সংক্ষেপে, এটি হলো গাড়ি চালানো বা যেকোনো যাত্রীবাহী যানবাহনে আরোহণ করার প্রতি এক ধরণের অনিয়ন্ত্রিত, তীব্র এবং অযৌক্তিক মানসিক আতঙ্ক।

অনেক সময় আমরা সাধারণ ড্রাইভিং ভয় বা অনভিজ্ঞতাজনিত দ্বিধাকে অ্যাম্যাক্সোফোবিয়ার সাথে গুলিয়ে ফেলি। তবে দুটোর মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। সাধারণ ভয়, আপনাকে সতর্ক করে এবং ট্রাফিক নিয়ম মানতে সাহায্য করে। অপরপক্ষে,  অ্যাম্যাক্সোফোবিয়া,  এটি একজন মানুষের চিন্তাশক্তি, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ও শরীরের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়াকে সম্পূর্ণ স্তব্ধ (Paralyze) করে দেয়।

এটি কীভাবে প্রকাশ পায়? (লক্ষণসমূহ)

অ্যাম্যাক্সোফোবিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে এবং মনে তীব্র কিছু শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন দেখা যায়। শারীরিক লক্ষণ হিসেবে এই ধরণের ব্যক্তিদের মাঝে হঠাৎ করে অতিরিক্ত ঘাম হওয়া, বুক চেপে আসা, হাত-পা থরথর করে কাঁপা, শ্বাসকষ্ট হওয়া, মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব এবং তীব্র ‘প্যানিক অ্যাটাক’ (Panic Attack) মত অবস্থা হতে পারে। মানসিক ও আচরণগত লক্ষণ হিসেবে এদের মাঝে, সর্বদাই বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটার তীব্র আতঙ্ক, গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলার অবচেতন ভয় দেখা দেয়। এরা চালকের আসনে বসা তো দূরের কথা— অন্যের চালিত গাড়িতে উঠতেও তীব্র অস্বস্তি বোধ করে। এদের মাঝে সাধারণত দীর্ঘমেয়াদে যেকোনো যানবাহন সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলার প্রবণতা দেখা যায়।

অ্যাম্যাক্সোফোবিয়ার মূল কারণ

কেন একজন মানুষের মনে যানবাহনের প্রতি এমন ভয়াবহ ভীতি তৈরি হয়? বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ কাজ করে। প্রথমত, অতীতের কোনো ট্রমা (PTSD)– পূর্বে নিজে কোনো বড় দুর্ঘটনার মুখোমুখি হওয়া, মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসা। কিংবা নিজের চোখের সামনে স্বজন বা কাউকে মারাত্মক দুর্ঘটনার শিকার হতে দেখা। দ্বিতীয়ত, নিয়ন্ত্রণ হারানোর অবচেতন মনের আতঙ্ক। এক্ষেত্রে চালকের আসনে বসলে নিজের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ার ভয়। মনে হওয়া যে একটু ভুল হলেই সবকিছু শেষ হয়ে যাবে। পরিশেষে, অন্যান্য মানসিক ব্যাধির উপস্থিতি দায়ী হতে পারে। প্যানিক ডিসঅর্ডার, এগোরাফোবিয়া (উন্মুক্ত বা জনবহুল স্থানে আটকে পড়ার ভয়) কিংবা অতিরিক্ত দুশ্চিন্তাগ্রস্ততায় (Anxiety) ভোগা ব্যক্তিরা সহজেই এ ফোবিয়ায় আক্রান্ত হতে পারেন।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: আমাদের দেশে ঝুঁকি কেন এত বেশি?

পশ্চিমা বিশ্বের উন্নত ট্রাফিক ব্যবস্থার তুলনায় বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও ট্রাফিক-সংকটময় দেশে অ্যাম্যাক্সোফোবিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার এবং এর তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ার ঝুঁকি বহুলাংশে বেশি। এর বেশ কয়েকটি প্রধান কারণ রয়েছে। প্রতমত, সড়কের বিশৃঙ্খলা ও বেপরোয়া ড্রাইভিং। উল্টো পথে গাড়ি আসা, সংকেত না মেনে ওভারটেকিং, ফিটনেসবিহীন গাড়ি এবং পথচারীদের অসচেতন পারাপার—এ সব মিলিয়ে বাংলাদেশের সড়ক যেন এক যুদ্ধক্ষেত্র। এই নিত্যদিনের অনিশ্চয়তা একজন চালকের মনস্তাত্ত্বিক চাপ কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। দ্বিতীয়ত, দুর্ঘটনার অডিও-ভিজুয়াল মিডিয়ার প্রভাব- প্রতিদিন সংবাদপত্র ও সোশ্যাল মিডিয়ায় গণপরিবহন বা সড়ক দুর্ঘটনার বীভৎস ছবি ও খবর আমাদের অবচেতন মনে স্থায়ী ভয়ের জন্ম দেয়। তৃতীয়ত, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও ‘বুলিং’- আমাদের সমাজে মানসিক স্বাস্থ্যকে এখনও গুরুত্বের সাথে দেখা হয় না। কেউ গাড়ি চালাতে ভয় পেলে তাকে “দুর্বল”, “কাপুরুষ” কিংবা “মেয়েলি স্বভাবের” বলে কটূক্তি করা হয়। “আরে একটু সাহস করলেই তো হয়!”—এ জাতীয় অগভীর সান্ত্বনা বা উপহাস ঐ ব্যক্তিকে আরও বেশি মানসিকভাবে ভেঙে ফেলে এবং তিনি নিজেকে গুটিয়ে নেন।

এই মানসিক বাধা থেকে উত্তরণের উপায়

অ্যাম্যাক্সোফোবিয়া কোনো নিরাময়হীন রোগ নয়। সঠিক মানসিক চিকিৎসা ও অভ্যাসের মাধ্যমে এই ভীতি পুরোপুরি জয় করা সম্ভব। এক্ষেত্রে বহুল ব্যবহৃত থেরাপি হল- কগনিটিভ বিহেভিওরাল থেরাপি (CBT)।  মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে এই থেরাপিতে আক্রান্ত ব্যক্তির মন থেকে অবচেতন দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর নেতিবাচক চিন্তাভাবনা দূর করে ইতিবাচক মনস্তত্ত্ব গড়ে তোলা হয়। এর পাশাপাশি, আর একটি থেরাপি যেটা আক্রান্ত ব্যক্তি নিজেই নিজের উপর এপ্লাই করতে পারে তার নাম হল গ্র্যাজুয়াল এক্সপোজার থেরাপি (Gradual Exposure Therapy)। এক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তি হঠাৎ করে ব্যস্ত রাস্তায় না নেমে ধাপে ধাপে ভয়ের মুখোমুখি হবে। যেমন— প্রথম ধাপে: শুধু বন্ধ গাড়ির ভেতরে বসে স্টিয়ারিং ধরে মানসিক প্রস্তুতি নেওয়া। দ্বিতীয় ধাপে: কোনো ফাঁকা ও নিরাপদ মাঠে কম গতিতে গাড়ি চালানো। তৃতীয় ধাপে: একজন অভিজ্ঞ বা পরিচিত মানুষকে পাশে বসিয়ে স্বল্প দূরত্বের ফাঁকা রাস্তায় ড্রাইভ করা এবং ধীরে ধীরে মূল রাস্তায় নামা। উপরোক্ত টেকনিকগুলোর পাশাপাশি আক্রান্ত ব্যক্তি ডিপ ব্রিদিং ও রিল্যাক্সেশন টেকনিক টি প্র্যাকটিস করা গাড়ি চালানোর সময় বা ওঠার পর আতঙ্ক শুরু হলে দীর্ঘ শ্বাস গ্রহণ ও ছাড়ার (Box Breathing) মাধ্যমে স্নায়ুকে শান্ত রাখার চেষ্টা করা যেতে পারে। এরপরও যদি বিষয়টা কেউ নিজে নিজে মোকাবেলা করতে না পারেন তবে, তাকে অবশ্যই একজন পেশাদার সাইকোলজিস্ট ও মানসিক চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।  

পরিশেষে বলতে হয়, গাড়ি চালাতে বা যানবাহনে চড়তে ভয় পাওয়া কোনো ব্যক্তিত্বের দুর্বলতা কিংবা লজ্জার বিষয় নয়। এটি আমাদের মস্তিষ্কের একটি প্রতিরক্ষামূলক কিন্তু অতিরিক্ত সংবেদনশীল মানসিক প্রতিক্রিয়া মাত্র। আমাদের পরিবার ও সমাজে এই অদৃশ্য ব্যাধি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং আক্রান্ত ব্যক্তিকে কটূক্তি না করে সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি আর মানসিক সহায়তাই পারে অ্যাম্যাক্সোফোবিয়ায় আক্রান্ত যেকোনো মানুষকে আবার স্বাধীন ও আত্মবিশ্বাসী জীবন ফিরিয়ে দিতে।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

0FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles