spot_img

বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষা কি মেধার সঠিক মূল্যায়ন করছে? মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে সংস্কারের প্রস্তাব

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সরকারি নিয়োগ পরীক্ষা হলো বিসিএস। প্রতি বছর লাখ লাখ তরুণ-তরুণী দেশের ভবিষ্যৎ প্রশাসক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে এই পরীক্ষায় অংশ নেন। কিন্তু বর্তমান প্রিলিমিনারি পরীক্ষার পদ্ধতি কি প্রার্থীদের প্রকৃত যোগ্যতা সঠিকভাবে যাচাই করতে পারছে? সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ সাইকোমেট্রিক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ড. মো. কামাল উদ্দীনের একটি গবেষণামূলক প্রস্তাবে উঠে এসেছে বর্তমান পরীক্ষা পদ্ধতির বেশ কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা। একইসাথে তিনি মনোবিজ্ঞানের আলোকে এই পরীক্ষা পদ্ধতির সংস্কারের একটি যুগোপযোগী মডেলও প্রস্তাব করেছেন। গবেষণাপত্রটির মূল বিষয়গুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

মুখস্থবিদ্যা বনাম বিশ্লেষণী ক্ষমতা বর্তমানে ২০০ নম্বরের বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় নম্বর বণ্টন অনেকটাই মুখস্থ বা ‘অ্যাচিভমেন্ট’ (পূর্ব অর্জিত জ্ঞান) নির্ভর। দেখা গেছে, পরীক্ষায় প্রায় ৮৫% (১৭০ নম্বর) নম্বরই বরাদ্দ থাকে তথ্য বা জ্ঞানভিত্তিক বিষয়ের ওপর। অন্যদিকে, একজন প্রশাসকের বাস্তব জীবনে যে যৌক্তিক চিন্তা, পরিস্থিতি বিচার বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা (অ্যাপ্টিটিউড) বেশি প্রয়োজন, তার জন্য বরাদ্দ মাত্র ১৫% (৩০ নম্বর)।

গবেষণাপত্রে একটি চমৎকার উদাহরণ দেওয়া হয়েছে: ধরুন, পরীক্ষায় পাস নম্বর ৭০। একজন প্রার্থী মুখস্থ অংশে ৩৫ ও মানসিক দক্ষতায় ৩৫ পেয়ে মোট ৭০ তুলে পাস করলেন। আরেকজন প্রার্থী মুখস্থ অংশে ৪০ কিন্তু মানসিক দক্ষতায় ২৯ পেয়ে মোট ৬৯ তুলে বাদ পড়লেন। অথচ মনোবিজ্ঞান ও নির্বাচন-বিজ্ঞানের মতে, যিনি বাদ পড়লেন, তাঁর মধ্যেই হয়তো নতুন জিনিস শেখার ও ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক দক্ষতা দেখানোর সম্ভাবনা বেশি ছিল। দুই ধরনের সম্পূর্ণ ভিন্ন মেধার স্কোরকে একসাথে যোগ করা এই পরীক্ষা পদ্ধতির একটি বড় দুর্বলতা।

ভাষা ও নৈতিকতা মূল্যায়নে ত্রুটি

পরীক্ষায় বাংলা ও ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য মিলিয়ে প্রায় ৩৫% নম্বর (৭০ নম্বর) থাকে। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, এখানে প্রার্থীর ভাষাগত যোগাযোগের বা ভাষা ব্যবহারের দক্ষতার চেয়ে সাহিত্যের ইতিহাস বা লেখকদের জীবনী বেশি যাচাই করা হয়। একইভাবে, নৈতিকতা যাচাইয়ের জন্য যে বহুনির্বাচনি (MCQ) প্রশ্ন থাকে, তা দিয়ে প্রার্থীর কেবল ‘নৈতিক জ্ঞান’ আছে কি না তা যাচাই করা যায়, কিন্তু তিনি বাস্তব পরিস্থিতিতে কতটা ‘সৎ বা নৈতিক আচরণ’ করবেন তা বোঝা যায় না।

শিক্ষাব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব

বিসিএস পরীক্ষার এই মুখস্থনির্ভর পদ্ধতির কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা গভীর একাডেমিক পড়াশোনা বা গবেষণার চেয়ে বিসিএস কোচিংয়ের দিকে বেশি ঝুঁকছেন। এর ফলে সৃজনশীল শিক্ষার্থীরা আগ্রহ হারাচ্ছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত শিক্ষাব্যবস্থার মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

কী সংস্কার প্রয়োজন?

ভবিষ্যতের যোগ্য প্রশাসক বেছে নিতে গবেষণাপত্রটিতে বিজ্ঞানভিত্তিক একটি নতুন মডেল প্রস্তাব করা হয়েছে:

  • আলাদা পাস: মেধাবীদের সঠিকভাবে মূল্যায়নের জন্য প্রার্থীদের এই উভয় অংশে আলাদাভাবে পাস করতে হবে।
  • বাস্তবমুখী প্রশ্ন: ভাষা পরীক্ষায় সাহিত্যের বদলে ব্যাকরণ ও যোগাযোগের দক্ষতা যাচাই করা এবং নৈতিকতা মূল্যায়নের জন্য মুখস্থ প্রশ্নের বদলে পরিস্থিতি-ভিত্তিক (Situational Judgment) প্রশ্ন রাখা।
  • নম্বর বিভাজন: ২০০ নম্বরের পরীক্ষাকে সমান দুই ভাগে ভাগ করা। ১০০ নম্বর থাকবে ‘সাধারণ জ্ঞান’ (General Studies) এর জন্য এবং বাকি ১০০ নম্বর থাকবে ‘যুক্তি ও মানসিক সক্ষমতা’ (Cognitive Aptitude Test)-এর জন্য। প্রস্তাবিত ১০০ নম্বরের ‘যুক্তি ও মানসিক সক্ষমতা’ (Cognitive Aptitude Test) অংশে মূলত ৫টি বিষয়ের ওপর প্রশ্ন থাকবে। প্রতিটি উপ-বিষয়ে সমান ২০ নম্বর করে বরাদ্দ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রশ্নগুলোর ধরন হবে নিম্নরূপ:
  1. মৌখিক যুক্তি (Verbal Reasoning): এখানে বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় প্রার্থীর কার্যকর ভাষাগত বা যোগাযোগের দক্ষতা যাচাই করা হবে। এই অংশে সাহিত্যের ইতিহাস বা লেখকদের জীবনী সম্পর্কিত কোনো মুখস্থনির্ভর প্রশ্ন থাকবে না। (নম্বর: ২০)
  2. যৌক্তিক বিশ্লেষণ (Logical Reasoning): প্রার্থীর বিশ্লেষণমূলক চিন্তা বা লজিক যাচাই করার প্রশ্ন থাকবে। (নম্বর: ২০)
  3. সংখ্যাগত যুক্তি (Numerical Reasoning): গাণিতিক ও সংখ্যাভিত্তিক যুক্তি সমাধানের দক্ষতা যাচাই করা হবে। (নম্বর: ২০)
  4. স্থানিক ও চিত্রভিত্তিক যুক্তি (Spatial Reasoning): আকার, স্থান বা চিত্রভিত্তিক যুক্তির মাধ্যমে প্রার্থীর মানসিক সক্ষমতা যাচাই করা হবে। (নম্বর: ২০)
  5. পরিস্থিতি-বিচার ও প্রশাসনিক নৈতিক যুক্তি (Situational Judgment & Ethical Reasoning): মুখস্থ নৈতিক জ্ঞানের বদলে বাস্তব প্রশাসনিক কাজ করতে গিয়ে প্রার্থী কতটা যৌক্তিক ও নৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, তা পরিস্থিতি-বিচারমূলক প্রশ্নের মাধ্যমে যাচাই করা হবে। (নম্বর: ২০)
  6. প্রস্তাবনা অনুযায়ী, এই ১০০ নম্বরের মানসিক সক্ষমতা অংশে (অংশ খ) প্রার্থীদের আলাদাভাবে পাস করতে হবে এবং সাধারণ জ্ঞানের নম্বর এর সাথে যুক্ত করে সম্মিলিত স্কোর তৈরি করা হবে না।
  • বিসিএস প্রিলিমিনারি কোনো সাধারণ পরীক্ষা নয়, এটি রাষ্ট্রের মানবসম্পদ নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার। মুখস্থবিদ্যার বদলে প্রকৃত মেধাবী, সৃজনশীল ও সমস্যা সমাধানে দক্ষ ভবিষ্যৎ প্রশাসক বেছে নিতে মনস্তাত্ত্বিক দিক বিবেচনা করে এই পরীক্ষা পদ্ধতির সংস্কার এখন সময়ের দাবি। বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন (বিপিএসসি) চাইলে বৈজ্ঞানিক এই পদ্ধতিগুলো প্রয়োগের মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও নির্ভুল ও সময়োপযোগী করে তুলতে পারে।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

0FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles