জীবনের বিভিন্ন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে না পেরে অনেকে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন এবং না মানসিক ব্যধিতে আক্রান্ত হন। আমাদের পারিবারিক ও সমাজ-ব্যবস্থা যতই জটিল হচ্ছে, মানসিক ব্যধিগ্রস্থ রোগীর সংখ্যা ততই বাড়ছে। মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যাক্তি যত তাড়াতাড়ি চিকিৎসা গ্রহণের জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন তার রোগ নিরাময় তত দ্রুত এবং সহজ হবে। যে মানসিক রোগ চিকিৎসা পদ্ধতিতে চিকিৎসক মনোবৈজ্ঞানিক চিকিৎসা পদ্ধতি অবলম্বন করে রোগীকে সুস্থ করেন তাকে সাইকোথেরাপি অথবা মনোচিকিৎসা পদ্ধতি বলা হয়।
নানা ধরণের মনোচিকিৎসা পদ্ধতি আছে এবং মনোচিকিৎসা পদ্ধতিগুলি সাধারণত: কোন মতবাদকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। তবে চিকিৎসক যে মতবাদের অনুসারী হোন না কেন তাঁর উদ্দেশ্যে থাকে রোগীর দু:খ কষ্ট লাঘব করা এবং দ্বন্দময় পরিস্থিতি থেকে তাকে মুক্ত করে আনন্দময়, সুন্দর, স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা।
অবাধ অনুষঙ্গ পদ্ধতির কথা বলতে গেলে সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মন:সমীক্ষণ পদ্ধতির কথা কিছু বলতে হয়। মান:সমীক্ষণ পদ্ধতির অনুসারীরা মূলত: মনোগতিশীলতা (Psychodaynamic) মতবাদের অনুসারী। অচেতনের উপর গুরুত্ব আরোপন করে ফ্রয়েড মনোবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় সূচনা করেছেন। স্নায়ুবিদ ফ্রয়েড প্রথমদিকে মানসিক ব্যাধি নিরাময়ে সংবেশন (Hypnosis ) পদ্ধতির আশ্রয় নিয়েছিলেন পরে জোসেফ ব্রুয়ারের ব্যক্তকরণ (Talking out) পদ্ধতিতে আকৃষ্ট হন। ফ্রয়েড লক্ষ্য করেন যে ব্যক্তকরনের ফলে রোগী তার দু:খ-কষ্ট লাঘবে সমর্থ হয় এবং মানসিক যন্ত্রনা বা অস্বস্তি হালকা হওয়ার ফলে রোগী সুস্থ বোধ করে। শান্ত পরিবেশে রোগী যাতে স্বজ্ঞানে তার মনে যা আসে তা চিকিৎসকের কাছে নির্বিঘ্নে এবং অবাধে বলতে পারে সে জন্য ফ্রয়েড রোগীকে উৎসাহিত করেন এবং বিশেষ ব্যাবস্থা গ্রহণ করেন এবং এ পদ্ধতির নাম দেন অবাধ অনুষঙ্গ (free association) । সুতরাং বলা যেতে পারে যে, অবাধ অনুষঙ্গ হচ্ছে মন:সমীক্ষণে ব্যবহৃত এমন একটি মনোবৈজ্ঞানিক চিকিৎসা কৌশল যেখানে চিকিৎসা চলাকালীন সময়ে রোগীর মনে চিন্তা, ভাবনা, অনুভূতি এবং আনুসঙ্গিক যা কিছু আসুক না কেন তা মৌখিকভাবে ব্যক্ত করার উৎসাহ প্রদান করা হয়। রোগীর ইচ্ছা, চাহিদা, আশা-আকাঙ্খা, ভয়, ক্রোধ সব কিছুই তার চিন্তা এবং অনুভূতিকে পরিচালিত করে। পরবর্তীতে ফ্রয়েড সংবেশন পদ্ধতির পরিবের্ত অবাধ অনুষঙ্গ পদ্ধতি প্রয়োগ করে মানসিক রোগের চিকিৎসা করেন।
অবাধ অনুষঙ্গের উদ্দেশ্য হল রোগীর মধ্যে এমন একটি মানসিক অবস্থার সৃষ্টি করা যে অবস্থায় রোগী মুক্ত মনে খোলাখুলিভাবে তার চিন্তা এবং অনুভূতিগুলি প্রকাশ করতে পারে। এ কাজটি আপাত:দৃষ্টিতে অত্যন্ত সহজ মনে হলেও বাস্তবে দেখা যায় অনেক রোগী তার অনুভূতিগুলি প্রকাশ করতে পারে না, থেমে যায়, এড়িয়ে যেতে চায় অথবা বলতে চায় না। এ ক্ষেত্রে রোগী মুক্ত মনে চিন্তা ভাবনাগুলি প্রকাশ করার জন্য বার বার তার চিকিৎসকের দ্বারা আশ্বাস পায়। অবাধ অনুষঙ্গকে প্রথমে রোগীর কাছে অবাস্তব এবং অর্থহীন মনে হলেও রোগীর মন রোগীকে কথা বলতে অনুপ্রাণিত করে। রোগী যা বলছে একজন দক্ষ থেরাপিষ্ট তা থকে আসলে দ্বন্দের মূল কারণটি বেছে নিতে চেষ্টা করেন এবং প্রয়োজন বোধে প্রশ্নের মাধ্যমে মাঝে মাঝে রোগীর কাছ থেকে আরো তথ্য সংগ্রহ করেন।
অবাধ অনুষঙ্গ পদ্ধতিতে মনের ভাব প্রকাশে একজন রোগী থেকে অন্য আরেকজন রোগীর মধ্যে অনেক পার্থক্য দেখা যায়। কোন কোন রোগী প্রথম সাক্ষাৎকারেই তার মনের দরজাটি খুলে ফেলতে পারেন আবার কেউ বা দরজায় সিড়িঁতেই আটকে যান। তখন রোগীকে সিড়িঁ থেকে দরজায় পৌছাবার কাজটি থেরাপিষ্ট নিজেই হাতে তুলে নেন। অবাধ অনুষঙ্গের বিষয়বস্ত রোগী নিজে ঠিক করেন। রোগীর সঙ্গে সম্পর্ক যুক্ত অথবা একেবারে সম্পর্ক নেই যাই রোগীর বিবেচনায় থাকুক না কেন দ্বিধাহীনভাবে রোগীকে থেরাপিষ্টের কাছে তা ব্যক্ত করতে হয়।
বাংলাদেশে প্রফেসর এম.ইউ. আহমেদ সর্ব প্রথম মানসিক রোগীদের চিকিৎসা ক্ষেত্রে মনোবৈজ্ঞানিক চিকিৎসা পদ্ধতি প্রয়োগ করেন। ১৯৪০ সালে তাঁর উদ্ভাবিত মনোবৈজ্ঞানিক চিকিৎসা পদ্ধতিকে তিনি মেডিষ্টিক সাইকোথেরাপি নামে অভিহিত করেছেন। মেডিষ্টিক শব্দটি ল্যাটিন শব্দ মেডেরী (mediri) থেকে প্রফেসর এম.ইউ.আহমেদ চয়ন করেছেন যার অর্থ রোগ নিরাময়। সুতরাং মেডিষ্টিক সাইকোথেরাপি শব্দের অর্থ হচ্ছে থেরাপিষ্টের নির্দেশে রোগীর ভেতর ধ্যানাবস্থা সৃষ্টি করে তার রোগ নিরাময়ে অথবা আত্ম-উন্নতিতে সহায়তা করা। সুতরাং একে ধ্যানভিত্তিক মনোবৈজ্ঞানিক চিকিৎসা পদ্ধতি বলা যেতে পারে। মেডিষ্টিক সাইকোথেরাপি সম্পূর্ণ রূপে মনোবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ব্যাক্তি বিশেষের ব্যাক্তিত্ব সবল করে তাকে শান্তিপূর্ণভাবে জীবন-যাপন করতে সহায়তা করে। ফ্রয়েডের মত প্রফেসর এম.ইউ. আহমেদ লক্ষ্য করেছিলেন যে সংবেশন পদ্ধতির সাহায্যে কোন রোগ নিরাময় করা গেলেও সে রোগের সব লক্ষণগুলোর পরিপূর্ণভাবে নিরাময় সম্ভব হয় না। মেডিষ্টিক সাইকোথেরাপিতে তাই রোগীর মধ্যে সংবেশনাবস্থা সৃষ্টি না করে প্রথমে তার ভেতর শিথিলতা, একাগ্রতা ও ধ্যানাবস্থা সৃষ্টি করা হয়। এরপর রোগীর উপরে অভিভাবন (suggesion) প্রয়োগ করা হয় এবং বাড়ীতে আত্ম -অভিভাবন (auto-suggesion) অনুশীলনের জন্যও উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
মেডিষ্টিক সাইকোথেরাপির সঙ্গে অন্যান্য মনোবৈজ্ঞানিক চিকিৎসার মিল থাকলেও এর কিছু নিজস্ব স্বকীয়তা আছে। পর্যবেক্ষণ, সাক্ষাৎকার এবং অভিভাবন এই তিনটি পর্যায়ে মেডিষ্টিক সাইকোথেরাপির গুরুত্বপূর্ণ কৌশল। পর্যবেক্ষণের সময় সাহায্যে প্রার্থীর প্রতিটি আচরণ খেয়াল রাখতে হয় এবং সাক্ষাৎকার গ্রহণের সময় তার বিভিন্ন উপসর্গগুলি কেস হিস্ট্রি আকারে খাতায় লিখে রাখতে হয়। সাধারণভাবে রোগীর ইতিহাস এক সাথে না লিখে প্রত্যেকদিন সাক্ষাৎকারের সময় তা লিখতে হয়। এ চিকিৎসার নির্ধারিত একঘন্টা সময়ের মধ্যে প্রথম পনের মিনিট রোগীর বিগত কয়েকদিনের ভাল-মন্দ সব ঘটনাবলী জেনে তা লিপিবদ্ধ করা হয়। পরের ত্রিশ মিনিট রোগীর মনে যা আসে তা নির্দ্বিধায় মুক্ত মনে বলে যেতে উৎসাহিত করা হয়। সুতরাং দেখা যাচ্ছে এই পদ্ধতিতে অবাধ অনুষঙ্গের ভূমিকাকে বিরাট গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ফ্রয়েডের অবাধ অনুষঙ্গ পদ্ধতির ন্যায় এখানে রোগী তার নিজস্ব অভিজ্ঞতা, ধ্যান-ধারনা ইত্যাদি সম্পর্কে বলতে পারায় তার মনের ভিতর পুঞ্জিভূত গ্লানি বা ব্যর্থতা অথবা চাপা উত্তেজনা প্রকাশ করে তা লাঘবের সুযোগ পায়। রোগী তার শৈশবকালীন অভিজ্ঞতা, মা-বাবার সাথে তার সম্পর্ক ইত্যাদি বর্ণনাকালে তার অবদমিত আশা, আকাঙ্খা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে এবং এ ভাবে থেরাপিষ্টও তার রোগের মূখ্য এবং গৌন কারণ অনুসন্ধানের জন্য সাহায্যেপ্রার্থীর জন্মবধি ইতিহাস এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করে থাকেন।
যেহেতু মেডিষ্টিক সাইকোথেরাপি পদ্ধতি হচ্ছে প্রধানত: অভিভাবন ভিত্তিক এবং নির্দেশনামূলক সেজন্য মেডিষ্টিক সাইকোথেরাপিতে ফ্রয়েড মন:সমীক্ষণ পদ্ধতির ন্যায় অবাধ অনুসঙ্গের সুযোগ থাকলেও এখানে থেরাপিষ্ট নিষ্ক্রিয় থাকেন না বরং সাহায্যেপ্রার্থীও রোগ মুক্তির উদ্দেশ্য সচেতনভাবে থেরাপিউটিক সাজেশন প্রয়োগ করেন এবং এ জন্যই মেডিষ্টিক সাইকোথেরাপি পদ্ধতিতে সাহায্যেপ্রার্থী এবং থেরাপিষ্ট উভয়কেই পর্যায়ক্রমে সক্রিয় এবং নিষ্ক্রিয় থাকতে হয়।
প্রাচ্যের সমাজ ব্যবস্থায় ছেলে-মেয়েরা যেমন পিতা-মাতার নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করতে অভ্যস্ত তেমনি রোগাক্রান্ত সাহায্যে প্রার্থীরাও স্বাধীনভাবে রোগমুক্তির সঠিক পন্থা নিজেরা খুঁজে নিতে পারে না। এমন কি চিকিৎসক কর্তৃক তার সমস্যা সমাধানের সূত্রগুলি তুলে ধরা সত্বেও সে সঠিক বা যথাযোগ্য সমাধান গ্রহণ করার ব্যাপারে চিকিৎসকের নির্দেশের অপেক্ষায় থাকে। তাই দেখা যায় এ পদ্ধতিতে প্রথমে রোগী কেন্দ্রিক চিকিৎসা ও শেষের দিকে নির্দেশনামূলক পদ্ধতি প্রয়োগের পক্ষপাতী।
যেহেতু কেমোথেরাপি এবং সাইকিয়াট্রিক চিকিৎসার মত মেডিষ্টিক সাইকোথেরাপিতে কোন ঔষধ প্রয়োগ করা হয় না এবং যেহেতু এই চিকিৎসায় রোগের কারণ খুঁজে বের করে চিকিৎসা করা হয় যে জন্য আমরা দেখতে পাই যে, এখানে অবাধ অনুসঙ্গের প্রয়োজন অত্যন্ত বেশী। রোগীর কথাবার্তার মাধ্যমে রোগের কারণ সণাক্তকরণ সহজ হয় এবং রোগী তার অব্যাক্ত উত্তেজনা বা অবদমিত মানসিক অবস্থা এবং আবেগময় অভিজ্ঞতাগুলি বর্ণনা করতে পেরে আবগেপ্রসূত পুঞ্জীভূত যাতনা লাঘব করতে সমর্থ হয়, রোগীর মানসিক অস্বস্তি অনেকখানি হালকা হয়ে যায় এবং রোগী সুস্থ বোধ করে।
প্রফেসর এম.ইউ. আহমেদের মেডিষ্টিক সাইকোথেরাপি মানসিক রোগীদের মনোবৈজ্ঞানিক চিকিৎসা প্রদান করার জন্য বাংলাদেশে উদ্ভাবিত একমাত্র মনোচিকিৎসা পদ্ধতি। পাশ্চাত্য এবং প্রাচ্যের ধ্যাণ ধারণার সংমিশ্রনে তিনি এই পদ্ধতিটি উদ্ভাবন করেন এবং বহু মানসিক রোগীদের সাফল্যের সঙ্গে চিকিৎসা করেন। তবে এই চিকিৎসা পদ্ধতির কিছু কিছু তাত্ত্বিক বিষয় তেমন পরিস্কার নয় এবং বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না। এই পদ্ধতিটি সকলে নিকট গ্রহণযোগ্য করার জন্য এবং কিছু প্রতিপাদ্য বিষয়ের অসামঞ্জতা দূর করে একে একটি স্বয়ং-সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক মনোচিকিৎসা পদ্ধতি হিসাবে প্রচলিত করার জন্য এর উপর গবেষণা অত্যাবশ্যক।
লেখক: প্রফেসর ড. রোকেয়া বেগম
ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
লেখাটি মনভুবন সংখ্যা ১ এ প্রকাশিত হয়েছিল।


