spot_img

শিকলহীন কারাবন্দী: বাংলাদেশের পথেঘাটে থাকা মানসিক ভারসাম্যহীনদের মনস্তত্ত্ব ও বাস্তবতা

ভোরবেলা কারওয়ান বাজারের মোড় কিংবা মাঝরাতে কমলাপুর স্টেশনের নির্জন প্ল্যাটফর্ম—একটি দৃশ্য প্রায় চিরস্থায়ী। জটপাকানো চুল, ময়লাটে শতচ্ছিন্ন পোশাক আর উদাসীন দৃষ্টি নিয়ে কেউ একজন বিড়বিড় করে কথা বলছেন আকাশের দিকে তাকিয়ে। আমরা পাশ কাটিয়ে চলে যাই, কেউ হয়তো দয়াপরবশ হয়ে দু-পাঁচ টাকা ছুড়ে দিই, আবার কেউ ভয়ার্ত চোখে দ্রুত পা চালাই। লোকজ ভাষায় আমরা তাদের বলি ‘পাগল’। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং নিউরোসাইন্সের ভাষায় তারা কোনো অলৌকিক বা অদ্ভুত সত্তা নন; তারা হলেন তীব্র মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত এমন একদল মানুষ, যাদের সমাজ ও বিজ্ঞান উভয়ই ব্যর্থ করেছে। তারা প্রকৃতপক্ষে তাদের নিজস্ব মস্তিষ্কের এক অদৃশ্য কারাগারে বন্দী—যেখানে দেয়াল নেই, শিকল নেই, কিন্তু মুক্তিও নেই।

১. মনস্তত্ত্বের আড়ালে বিজ্ঞানের সত্য: কেন এমন হয়?

পথের এই মানুষদের জীবনকে বিশ্লেষণ করতে গেলে আমাদের আবেগ সরিয়ে নিউরোসায়েন্সের সাহায্য নিতে হবে। এদের অধিকাংশেরই বর্তমান অবস্থার পেছনে প্রধান কারণ তীব্র মানসিক ব্যাধি (Severe Mental Illness)

  • সিজোফ্রেনিয়া (Schizophrenia): এটি একটি নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল ডিসঅর্ডার। নিউরোসায়েন্স অনুযায়ী, মস্তিষ্কের ডোপামিন (Dopamine) নামক নিউরোট্রান্সমিটারের ভারসাম্যহীনতা এর মূল কারণ। ডোপামিন যখন মস্তিষ্কের মেসোলিম্বিক পথে অতিরিক্ত সক্রিয় হয়, তখন ব্যক্তি এমন কিছু শব্দ শোনে (Auditory Hallucination) বা দৃশ্য দেখে যা বাস্তবে নেই। তারা মনে করে কেউ তাদের তাড়া করছে বা হত্যা করতে চায় (Paranoia)। এই আতঙ্ক থেকেই তারা ঘর ছেড়ে অজানার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে।
  • ডিলুশনাল ডিসঅর্ডার (Delusional Disorder): অনেক সময় ব্যক্তি তার নিজের পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তইতে পড়ে যায়। কেউ হয়তো নিজেকে কোনো বড় আধ্যাত্মিক শক্তি বা উচ্চপদস্থ কেউ মনে করতে শুরু করে। একে বলা হয় ‘গ্র্যান্ডিওস ডিলুশন’। এই ঘোরের কারণেই তিনি হয়তো রাজপথকে নিজের সাম্রাজ্য মনে করে সেখানেই বছরের পর বছর কাটিয়ে দেয়।
  • ট্রমা ও পিটিএসডি (PTSD): পারিবারিক বিপর্যয়, তীব্র দারিদ্র্য বা প্রিয়জনের মৃত্যু থেকে সৃষ্ট দীর্ঘস্থায়ী মানসিক আঘাত মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা (Amygdala)-কে অতি-সক্রিয় করে তোলে। ফলে ব্যক্তি চরম সিদ্ধান্তহীনতা ও স্মৃতিকাতরতায় ভুগে সমাজ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।

২. বাংলাদেশের বাস্তবতা ও জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH)-এর ২০১৮-১৯ সালের জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় ১৮.৭% কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগছে। এর মধ্যে প্রায় ৯২.৪% মানুষই প্রয়োজনীয় চিকিৎসার আওতার বাইরে। পথে থাকা এই মানুষদের ক্ষেত্রে বাস্তবতা আরও করুণ। যেখানে একজন সাধারণ নাগরিকের জন্য মানসিক চিকিৎসা সহজলভ্য নয়, সেখানে এই ছিন্নমূল মানুষদের জন্য কোনো কার্যকর ‘কমিউনিটি ফলো-আপ’ নেই। পরিবার যখন এদের চিকিৎসা করাতে ব্যর্থ হয় বা সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হওয়ার ভয় পায়, তখন অনেক সময় কৌশলে এদের স্টেশনে বা মাজারে ফেলে আসা হয়।

৩. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর নির্দেশিকা ও করণীয়

World Health Organization (WHO)-এর mhGAP (Mental Health Gap Action Programme) নির্দেশিকা অনুযায়ী, মানসিক রোগ কেবল বিশেষায়িত হাসপাতালের বিষয় নয়, একে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সাথে যুক্ত করা জরুরি।

  • অ-বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা: গ্রামের ডাক্তার বা নার্সদের মানসিক রোগের প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্তকরণে প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন যাতে রোগটি জটিল হওয়ার আগেই চিকিৎসা শুরু করা যায়।
  • মানবাধিকার সুরক্ষা: WHO-এর মতে, মানসিক রোগীদের শিকলবন্দী করা বা অবহেলা করা চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন। বাংলাদেশের রাস্তায় থাকা এই মানুষদের জন্য পুনর্বাসন কেন্দ্র এবং নিয়মিত দীর্ঘমেয়াদী ওষুধের (যেমন- অ্যান্টি-সাইকোটিক ড্রাগস) ব্যবস্থা করা সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ।

৪. নিউরোবায়োলজিক্যাল ও সামাজিক সংকট

রাস্তায় দীর্ঘদিনের বসবাস মস্তিষ্কের গঠনগত পরিবর্তন ঘটায়। অপুষ্টি এবং দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেস মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাস (Hippocampus)-কে সংকুচিত করে দেয়, যা তাদের স্মৃতিশক্তি এবং যৌক্তিক চিন্তা করার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ফলে এক সময় তারা নিজেদের নাম বা বাড়ির ঠিকানাও ভুলে যায়। সমাজ যখন এদের ‘পাগল’ বলে অবহেলা করে, তখন তাদের বিচ্ছিন্নতা আরও বেড়ে যায়। বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে তারা অপরাধী বা অদ্ভুত কেউ নন, তারা কেবল মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্যের শিকার।

৫. চিকিৎসার অভাব এবং এর পরিণতি

বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামো এখনও অপ্রতুল। বিশেষ করে গ্রামে এবং ছোট শহরগুলোতে মানসিক রোগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, মনোবিজ্ঞানী এবং থেরাপিস্টের অভাব রয়েছে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য নির্দিষ্ট বিভাগ থাকলেও, সেখানে রোগীর তুলনায় সুযোগ-সুবিধা অনেক কম। বেসরকারি চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল, যা দরিদ্র মানুষের সাধ্যের বাইরে। চিকিৎসার অভাবে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা আরও গুরুতর আকার ধারণ করে এবং ব্যক্তির স্বাভাবিক জীবনে ফেরা কঠিন হয়ে পড়ে। পথে থাকা মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য চিকিৎসা আরও কঠিন কারণ তাদের স্থিতিশীল ঠিকানা বা সহায়তা ব্যবস্থা নেই।

উপসংহার

“শিকলহীন কারাবন্দী” কথাটি এদের জন্য আক্ষরিক অর্থেই সত্য। তারা শিকলে বাঁধা না থাকলেও তাদের নিজস্ব মস্তিষ্কের বিভ্রমের মধ্যে বন্দী। বাংলাদেশে এই সংকটের সমাধানে প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ। পথের প্রতিটি মানুষের পেছনে লুকিয়ে আছে একেকটি করুণ নিউরোবায়োলজিক্যাল যুদ্ধ, যা কেবল আমাদের সহানুভূতি নয়, সুশৃঙ্খল চিকিৎসার দাবি রাখে। আপনার আশেপাশে এমন কাউকে দেখলে উপহাস না করে, স্থানীয় প্রশাসন বা মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নেওয়ার চেষ্টা করুন।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

0FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles