আমরা অনেক সময় মনে করি আমাদের সঙ্গীর কোনো আচরণ বা বাইরের কোনো পরিস্থিতিই আমাদের সম্পর্কের সব অশান্তির মূল কারণ। কিন্তু প্রখ্যাত ক্লিনিকাল সাইকোলজিস্ট ডা. রাসেল গ্রিগার (২০১৫) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, বাইরের ঘটনার চেয়ে আমরা সেই ঘটনাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করছি বা আমাদের মনের ভেতর কোন ধরণের বিশ্বাস পোষণ করছি, সেটিই আমাদের আবেগীয় অস্থিরতার প্রধান কারণ। ডা. গ্রিগার এই ক্ষতিকর চিন্তাভাবনাগুলোকে ‘ছয়টি মারাত্মক বিশ্বাস‘ (Six Killer Beliefs) হিসেবে অভিহিত করেছেন।
নিচে এই ছয়টি বিশ্বাসের বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. পার্সোনালাইজেশন (Personalization)
যখন আপনার সঙ্গী আপনার অপছন্দনীয় কোনো কাজ করেন, তখন আপনি ধরে নেন যে তিনি আপনাকে গুরুত্ব দেন না অথবা আপনাকে কষ্ট দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এমনটা করেছেন। আপনি হয়তো ভাবছেন, “তিনি আমাকে মোটেও ভালোবাসেন না,” অথচ প্রকৃত সত্য হলো সেই আচরণটি হয়তো কেবলই তার ব্যক্তিত্বের একটি স্বাভাবিক ধরণ এবং এটি আপনার সাথে ব্যক্তিগতভাবে সম্পর্কিত নয়। এই ধরণের চিন্তা আপনাকে অযথা মানসিকভাবে আঘাত দেয়।
২. পারফেকশনিস্টিক ডিমান্ডিং (Perfectionistic Demanding)
এটি হলো সঙ্গীর কাছ থেকে সবসময় নিখুঁত আচরণ আশা করা। যখন আপনি মনে মনে ‘অবশ্যই’ (must) বা ‘উচিত’ (should) শব্দগুলো ব্যবহার করে দাবি করেন যে সঙ্গী ভুল করতে পারবেন না, তখন সামান্য ত্রুটিও আপনার মনে প্রচণ্ড ক্রোধের সৃষ্টি করে। মনে রাখবেন, আপনার সঙ্গী একজন ভুলত্রুটি সম্পন্ন মানুষ, কোনো দেবদূত নন।
৩. নিডিনেস বা অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা (Neediness)
ভালোবাসা পাওয়ার স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষাকে যখন আপনি বেঁচে থাকার জন্য ‘অনিবার্য প্রয়োজন’ হিসেবে ধরে নেন (যেমন: “আমি তাকে ছাড়া বাঁচব না” বা “তাকে ছাড়া আমার অস্তিত্ব নেই”), তখন তাকে ‘নিডিনেস’ বলা হয়। এই বিশ্বাসের ফলে মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে এবং সঙ্গীকে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে, যা সম্পর্ককে বিষিয়ে তোলে।
৪. অ্যাফুল্টাইজিং বা সব কিছুকে ভয়াবহ করে দেখা (Awfulizing)
এটি হলো কোনো সামান্য নেতিবাচক ঘটনাকে প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি বড় বা ভয়াবহ করে দেখা। কোনো সমস্যাকে কেবল ‘দুর্ভাগ্যজনক’ না ভেবে সেটিকে একটি ‘চরম বিপর্যয়’ হিসেবে গণ্য করলে মনে হয় যে সেটি সহ্য করার ক্ষমতা আপনার নেই। এই ধরণের অতি-রঞ্জিত চিন্তা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হওয়ার একটি বড় কারণ।
৫. লো ফ্রাস্ট্রেশন টলারেন্স (Low Frustration Tolerance)
সম্পর্কের স্বাভাবিক কঠিন সময় বা অস্বস্তিগুলো সহ্য করতে না পারার বিশ্বাসই হলো লো ফ্রাস্ট্রেশন টলারেন্স। যখন কেউ মনে করেন যে সম্পর্কের কোনো জটিলতা বা দুঃখ তিনি সহ্য করতে পারবেন না, তখন তিনি ছোটখাটো সমস্যাতেও অতিমাত্রায় প্রতিক্রিয়া দেখান অথবা সমস্যা থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
৬. ড্যামনিং বা সত্তাকেই দোষারোপ করা (Self- or Other Damning)
সঙ্গীর বা নিজের কোনো একটি ভুল কাজের জন্য তার বা নিজের পুরো সত্তাকেই ‘খারাপ’, ‘মূল্যহীন’ বা ‘অযোগ্য’ বলে বলে গণ্য করা হলো ড্যামনিং। এটি মানুষকে কেবল একটি নির্দিষ্ট ভুলের ফ্রেমে আটকে ফেলে এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ কমিয়ে দেয়। এর ফলে সুস্থভাবে সমস্যা সমাধানের পথ বন্ধ হয়ে যায়।
অশান্তি দূর করার উপায় কী?
ডা. রাসেল গ্রিগার (২০১৫) এর মতে, এই বিশ্বাসগুলো থেকে মুক্তি পেতে হলে যা করতে হবে-
বিশ্বাসের সত্যতা যাচাই: কোনো নেতিবাচক বিশ্বাসকে ধ্রুব সত্য বলে মেনে না নিয়ে সেটিকে একটি ‘অনুমান’ (hypothesis) হিসেবে গণ্য করা এবং সেটির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলাই হলো হেলদি স্কেপটিসিজম। মনে রাখতে হবে, আপনার মনের নেতিবাচক চিন্তাগুলো কেবলই আপনার ‘বিশ্বাস’, সেগুলো সবসময় বাস্তব সত্য বা ফ্যাক্ট নাও হতে পারে।
যৌক্তিক চ্যালেঞ্জ বা ডিসপুটেশন (Skeptical Disputation): আপনার মনের ভেতর যখন ‘মারাত্মক বিশ্বাস’ (Killer Beliefs) উঁকি দেয়, তখন হেলদি স্কেপটিসিজম ব্যবহার করে সেগুলোকে চ্যালেঞ্জ করতে হয় । এজন্য ডা. গ্রিগার তিনটি পাওয়ার প্রশ্ন (Power Questions) ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন: ১. এই বিশ্বাসটি কি সত্যি বা বৈধ? কেন? (যেমন: সঙ্গী দেরি করায় আপনি ভাবলেন তিনি আপনাকে গুরুত্ব দেন না, এটি কি আসলেই সত্যি?) ২. এই বিশ্বাসের কারণে আমার আবেগীয় ও আচরণগত প্রতিক্রিয়া কেমন হচ্ছে? এটি কি আমার সম্পর্কের জন্য ভালো নাকি ক্ষতিকর? ৩. এই বিশ্বাসটি যদি আমার মনে না থাকত, তবে কি আমি আরও ভালো থাকতাম? কীভাবে?
ক্ষমতায়ন (Empowerment): হেলদি স্কেপটিসিজম আপনাকে নিজের আবেগের দায়ভার নিতে শেখায়। এটি আপনাকে বুঝতে সাহায্য করে যে সঙ্গী না বদলালেও আপনি নিজের চিন্তাভাবনা পরিবর্তনের মাধ্যমে সম্পর্কের অস্থিরতা কমিয়ে আনতে পারেন।
পরিশেষে বলা যায়, সম্পর্কের বহিরাগত পরিস্থিতি বা সঙ্গীর আচরণ নয়, বরং আমাদের অবচেতন মনের ‘ছয়টি মারাত্মক বিশ্বাসই’ অধিকাংশ আবেগীয় অশান্তির মূল চালিকাশক্তি । ডা. রাসেল গ্রিগারের এই মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, অন্যের আচরণ পরিবর্তন করা আমাদের হাতে না থাকলেও, নিজের চিন্তাভাবনার নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ আমাদের নিজেদের কাছেই । মনের নেতিবাচক ধারণাকে পরম সত্য না ভেবে যখন আমরা ‘হেলদি স্কেপটিসিজম’ ও ‘পাওয়ার প্রশ্ন’-এর মাধ্যমে সেগুলোকে যৌক্তিক চ্যালেঞ্জ জানাতে শিখব, তখনই সম্পর্কের অমিলগুলোর ঊর্ধ্বে উঠে মানসিক শান্তি ও সুস্থ বন্ধন বজায় রাখা সম্ভব হবে । দিনশেষে, সুখী সম্পর্কের চাবিকাঠি সঙ্গীর নিখুঁত আচরণে নয়, বরং নিজের চিন্তার পরিপক্বতা ও আবেগীয় ক্ষমতায়নের মধ্যে নিহিত ।
লেখকঃ প্রফেসর, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।


