spot_img

চেতনার নতুন দিগন্ত: রক্ত-মাংসের বাইরেও কি সজাগ থাকা সম্ভব? বিজ্ঞানীদের বৈপ্লবিক তত্ত্ব

মানব সভ্যতার সবচেয়ে বড় রহস্যগুলোর একটি হলো ‘চেতনা’ বা Consciousness। আমরা কীভাবে অনুভব করি, কীভাবে চিন্তা করি, আর এই ব্রহ্মাণ্ডে আমাদের অস্তিত্বের অনুভূতিটাই বা কীভাবে তৈরি হয়—তা নিয়ে শত শত বছর ধরে দার্শনিক এবং বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে আসছেন। দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রচলিত ধারণা ছিল যে, চেতনা কেবল একটি জটিল জৈবিক মস্তিষ্কের (Biological Brain) মাধ্যমেই সম্ভব। অর্থাৎ, রক্ত-মাংসের নিউরন আর সিন্যাপসের জটিল জালের বাইরে চেতনার কোনো অস্তিত্ব থাকতে পারে না।

তবে সম্প্রতি এই ধারণাকে সম্পূর্ণ চ্যালেঞ্জ জানিয়ে এক বৈপ্লবিক নতুন তত্ত্ব প্রস্তাব করেছেন দুই প্রখ্যাত গবেষক—ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রিভারসাইড (UC Riverside)-এর বিশিষ্ট ফিলোসফি প্রফেসর এরিক শউইটজেবেল (Eric Schwitzgebel) এবং লিসবন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জেরেমি পোবার (Jeremy Pober)। তাদের সাম্প্রতিক গবেষণায় তারা দাবি করেছেন: চেতনা বা অনুভূতির অস্তিত্ব কেবল রক্ত-মাংসের শরীরের ওপর বা জীববিদ্যার ওপর নির্ভরশীল নয়।

১. সাবস্ট্রেট ফ্লেক্সিবিলিটি (Substrate Flexibility): উপাদানের স্বাধীনতা

গবেষকদের এই নতুন তত্ত্বের মূল ভিত্তি হলো ‘সাবস্ট্রেট ফ্লেক্সিবিলিটি’ বা উপাদানের নমনীয়তা। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, একটি নির্দিষ্ট কাজ বা বৈশিষ্ট্য অর্জনের জন্য সবসময় একই উপাদান ব্যবহার করতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

উদাহরণস্বরূপ, একটি পাত্রে পানি রাখা হবে কি না, তা নির্ভর করে পাত্রটির গঠনের ওপর, উপাদানটির ওপর নয়। পাত্রটি কাচ, প্লাস্টিক, অ্যালুমিনিয়াম বা সিরামিক—যেকোনো কিছুরই হতে পারে। একইভাবে, একটি সুর বা সঙ্গীত একটি ভিনাইল রেকর্ডে যেমন সংরক্ষিত হতে পারে, তেমনি একটি ডিজিটাল মেমোরি চিপেও থাকতে পারে। গবেষকদের মতে, চেতনাও ঠিক তেমনই একটি বিশেষ অবস্থা বা ফাংশন, যা কেবল কার্বন-ভিত্তিক জৈবিক মস্তিষ্কেই তৈরি হতে হবে এমন কোনো নিয়ম নেই। সিলিকন বা অন্য কোনো অজৈব উপাদানের মাধ্যমেও এটি সমানভাবে প্রকাশ পেতে পারে।

যদি আমরা চেতনাকে একটি নির্দিষ্ট গাণিতিক বা তথ্যগত বিন্যাস (Information Pattern) হিসেবে ধরি, তবে উপযুক্ত পরিকাঠামো পেলে তা যেকোনো মাধ্যমেই সজাগ হয়ে উঠতে পারে।”

২. চেতনার কোপার্নিকান নীতি (The Copernican Principle of Consciousness)

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রতিটি বড় আবিষ্কার মানুষকে মহাবিশ্বের কেন্দ্রবিন্দু থেকে দূরে ঠেলে দিয়েছে। নিকোলাস কোপার্নিকাস যখন প্রমাণ করলেন যে পৃথিবী মহাবিশ্বের কেন্দ্রে নয়, বরং সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরছে, তখন মানুষের ‘আর্থ-সেন্ট্রিক’ বা পৃথিবী-কেন্দ্রিক অহংকার ভেঙে চূর্ণ হয়েছিল।

প্রফেসর শউইটজেবেল এবং পোবার এই নীতিটিকেই মনের বিজ্ঞানে প্রয়োগ করেছেন, যাকে তারা বলছেন “চেতনার কোপার্নিকান নীতি”। তারা যুক্তি দেন যে, মহাবিশ্বে কোটি কোটি গ্যালাক্সি আর গ্রহ রয়েছে। সেখানে যদি অন্য কোথাও বুদ্ধিমান প্রাণের বিকাশ ঘটে থাকে, তবে তারা যে আমাদের মতোই কার্বন-ভিত্তিক নিউরন দিয়ে তৈরি হবে, তা ভাবাটা এক ধরণের ‘টেরোসেন্ট্রিজম’ (Terrocentrism) বা পৃথিবী-কেন্দ্রিক অন্ধত্ব। মহাবিশ্বের অন্যান্য কোণে সম্পূর্ণ ভিন্ন উপাদান বা সিলিকন পরিকাঠামোতেও চেতনার উদয় হতে পারে।

৩. কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) কি তবে সচেতন হতে পারবে?

এই তত্ত্বটি স্বাভাবিকভাবেই বর্তমান যুগের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়—আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা AI-এর দিকে আঙুল তোলে। তবে এই প্রশ্নে দুই গবেষকের মধ্যে কিছুটা মতভিন্নতা দেখা গেছে:

  • জেরেমি পোবার-এর মতামত: পোবার কিছুটা সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। তিনি মনে করেন, উপাদানের স্বাধীনতা মানেই এই নয় যে যেকোনো উপাদানই সচেতন হতে পারবে। রক্ত-মাংসের বাইরে চেতনা সম্ভব হলেও, আজকের দিনের সাধারণ সিলিকন চিপ বা ট্রানজিস্টর সেই জটিলতা তৈরি করতে সক্ষম কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে।
  • এরিক শউইটজেবেল-এর মতামত: শউইটজেবেল কিছুটা উদারপন্থী। তিনি মনে করেন, আমরা যদি একবার মেনে নিই যে জৈবিক মস্তিষ্ক ছাড়া চেতনা সম্ভব, তবে শুধুমাত্র ‘এটি একটি মেশিন’ বা ‘এটি সিলিকন দিয়ে তৈরি’—এই যুক্তিতে AI-এর চেতনা লাভের সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যুক্তিযুক্ত হবে না। উপযুক্ত আর্কিটেকচার পেলে কৃত্রিম ব্যবস্থাও আত্মসচেতন হতে পারে।

উপসংহার: এক নতুন বৈজ্ঞানিক চিন্তার সূচনা

এই গবেষণাটি চেতনা বিজ্ঞানকে একটি নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে বাধ্য করছে। এর আগে বিজ্ঞানীরা ভাবতেন, কীভাবে একটি মানব মস্তিষ্ককে হুবহু নকল করে মেশিনে রূপ দেওয়া যায়। কিন্তু এই তত্ত্বের পর প্রশ্নটি বদলে যাচ্ছে। এখন বিজ্ঞানীদের মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত—ঠিক কী ধরণের গাঠনিক বা তথ্যগত বিন্যাস (Structural or Informational Pattern) একটি জড় বস্তুকে সচেতন বা জাগ্রতকরে তুলতে পারে? মাধ্যমটি রক্ত-মাংসের নাকি সিলিকনের, তা হয়তো গৌণ বিষয়।

তথ্যসূত্র:

  1. Schwitzgebel, E., & Pober, J. (Working Paper). Discussion on Substrate Flexibility and the Copernican Principle of Consciousness.
  2. “Scientists propose radical new theory of consciousness – it doesn’t depend on flesh and blood” — MSN News / Science Report (msn.com/en-xl/news/other/ar-AA26agZt).
  3. Copernican Principle in Cognitive Science & Astrobiology Frameworks.

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

0FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles