আমরা অনেকেই আমাদের লাইফ পার্টনার বা সঙ্গীর কিছু অভ্যাসে চরম বিরক্ত হই। যেমন—কখনো সে ঘরের চাবি কোথায় রেখেছে ভুলে যায়, কোনো জরুরি কথা বললে হা করে তাকিয়ে থেকেও অন্য দুনিয়ায় হারিয়ে যায়, কিংবা একটা কাজও সময়মতো শেষ করতে পারে না।
আমরা অনেক সময় রেগে গিয়ে ভাবি, “ও তো আমাকে পাত্তাই দেয় না” কিংবা “মানুষটা দিন দিন বড্ড অলস আর দায়িত্বজ্ঞানহীন হয়ে যাচ্ছে।”
কিন্তু একটু থামুন! যাকে আপনি অলসতা বা অবহেলা ভাবছেন, তা আসলে কোনো সাধারণ বদভ্যাস নাও হতে পারে। হতে পারে তিনি ADHD (Attention-Deficit/Hyperactivity Disorder) নামের একটি মানসিক বা নিউরোলজিক্যাল সমস্যায় ভুগছেন, যা এখনো নির্ণয় করা হয়নি।
বিশ্বের কোটি কোটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ এই সমস্যা নিয়ে বেঁচে আছেন, অথচ তারা নিজেরাও জানেন না যে তাদের ব্রেইন অন্যদের চেয়ে একটু আলাদাভাবে কাজ করে। আজ আমরা আলোচনা করব মনোবিজ্ঞানীদের মতে এমন ৯টি ক্লাসিক লক্ষণ, যা দেখে বুঝবেন আপনার পার্টনার ডায়াগনোসিসহীন এডিএইচডি-তে ভুগছেন কি না।
১. চিরস্থায়ী অগোছালো জীবন (Chronic Disorganization)
আপনার পার্টনারের ঘর, আলমারি বা টেবিল কি সবসময় মনে হয় যেন মাত্রই একটা টর্নেডো বয়ে গেছে? জামাকাপড়, কাগজপত্র বা ঘরের জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখা এদের জন্য এক অসম্ভব যুদ্ধ। তারা চাইলেও সবকিছু গুছিয়ে রাখতে পারেন না।
২. কথায় কথায় ‘জোন আউট‘ হওয়া বা হারিয়ে যাওয়া (Zoning Out)
আপনি হয়তো সামনাসামনি বসে খুব সিরিয়াস কোনো পারিবারিক বা রোমান্টিক কথা বলছেন, তিনি আপনার দিকে তাকিয়েও আছেন—কিন্তু হঠাৎ খেয়াল করলেন তার মন আসলে মঙ্গোলিয়ায় ঘুরতে গেছে! তারা দীর্ঘক্ষণ কোনো সাধারণ আলোচনায় মন ধরে রাখতে পারেন না।
৩. সবকিছু ভুলে যাওয়ার রোগ (Forgetfulness)
“আই অ্যাম সরি, আমি একদম ভুলে গিয়েছিলাম!”—এই বাক্যটি কি আপনার পার্টনারের মুখে প্রায়ই শোনেন? জন্মদিন, অ্যানিভার্সারি, বাজারের ফর্দ কিংবা ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট—সবকিছু ভুলে যাওয়া এদের প্রতিদিনের গল্প। এমনকি ফোন বা মানিব্যাগ কোথায় রেখেছেন, তা খুঁজতে খুঁজতেই এদের দিন পার হয়।
৪. আবেগের রোলার কোস্টার (Emotional Dysregulation)
এই ভালো তো এই হুট করে চরম খিটখিটে বা রাগান্বিত! এডিএইচডি আক্রান্ত ব্যক্তিরা ছোটখাটো মানসিক চাপ বা সমালোচনা একদম সহ্য করতে পারেন না। সামান্য একটা কারণে তারা ভীষণ হাইপার বা ভেঙে পড়তে পারেন।
৫. “আজ নয়, কাল করব” (Severe Procrastination)
যেকোনো কাজ, বিশেষ করে যেটায় একটু বেশি মনোযোগ দিতে হয়, তা তারা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ফেলে রাখেন। কাজের ডেডলাইন একদম মাথার ওপর না আসা পর্যন্ত তাদের ভেতরের এনার্জি বা মোটিভেশন কাজ করে না।
৬. অর্ধেক কাজ করে ফেলে রাখা (Incomplete Projects)
তারা হয়তো খুব আগ্রহ নিয়ে একটা নতুন বই পড়া শুরু করলেন, একটা আইডিয়া নিয়ে কাজ শুরু করলেন কিংবা ঘরের একটা কোণ গোছাতে বসলেন। কিন্তু অর্ধেক হতেই তাদের সেই চরম উত্তেজনা কর্পূরের মতো উড়ে যায়! কাজটি মাঝপথে ফেলে রেখে তারা আবার নতুন কোনো কাজে হাত দেন।
৭. হুটহাট প্ল্যান ও ঝোঁকের মাথায় সিদ্ধান্ত (Impulsivity)
ভবিষ্যতের কথা চিন্তা না করে হুট করে বড় অঙ্কের টাকা খরচ করে ফেলা, শখের বশে দামি কিছু কিনে ফেলা কিংবা হুট করে চাকরি ছেড়ে দেওয়ার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ তারা মুহূর্তের মধ্যে করে ফেলতে পারেন। এদের মধ্যে “আগে কাজ, পরে চিন্তা” করার প্রবণতা দেখা যায়।
৮. এক জায়গায় শান্ত হয়ে বসতে না পারা (Physical Restlessness)
টিভি দেখতে বসলে বা রেস্টুরেন্টে খেতে বসলে তারা কি সারাক্ষণ পা নাচান, আঙুল ফোটান বা বারবার বসার পজিশন বদলান? এডিএইচডি আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের মনের ভেতর সবসময় এক ধরণের অস্থিরতা কাজ করে, যেন তাদের ভেতরে একটা মোটর চলছে যা তাদের থামতে দিচ্ছে না।
৯. সামান্য সমালোচনাতেই মন ভেঙে যাওয়া (Rejection Sensitivity)
আপনি হয়তো খুব সাধারণ একটা ফিডব্যাক দিলেন বা কোনো বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করলেন, কিন্তু তিনি সেটাকে অনেক বড় “প্রত্যাখ্যান” বা অপমান হিসেবে ধরে নিলেন। সামান্য নেতিবাচক কথা বা রিজেকশন তাদের মনকে মারাত্মকভাবে ক্ষতবিক্ষত করে তোলে।
সম্পর্কের ওপর এর নীরব আঘাত: আপনি কি পার্টনার নাকি প্যারেন্ট?
যখন একজন পার্টনারের এডিএইচডি থাকে এবং তা ধরা পড়ে না, তখন সম্পর্কে এক অদ্ভুত ডাইনামিক তৈরি হয়। সুস্থ পার্টনারকে তখন মনে হয় তিনি স্ত্রীর ভূমিকা বাদ দিয়ে “মায়ের” ভূমিকা পালন করছেন, কিংবা স্বামী বাদ দিয়ে “বাবার” মতো গাইড করছেন। সমস্ত দায়িত্ব একা টানতে টানতে সুস্থ সঙ্গীটি একসময় মানসিকভাবে ক্লান্ত (Burnout) হয়ে পড়েন।
আমাদের করণীয় কী?
যদি আপনার সঙ্গীর সাথে এই লক্ষণগুলো মিলে যায়, তবে তার ওপর চিৎকার-চেঁচামেচি বা তাকে দোষারোপ করা বন্ধ করুন। মনে রাখবেন, এটি অলসতা নয়, এটি একটি মেডিকেল কন্ডিশন।
- সহানুভূতি দেখান: বুঝুন যে তিনি ইচ্ছা করে এমন করছেন না।
- ছোট ছোট টাস্ক দিন: একবারে অনেক বড় দায়িত্ব না দিয়ে কাজগুলোকে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে দিন।
- প্রফেশনাল হেল্প নিন: সবচেয়ে ভালো হয় কোনো থেরাপিস্ট বা সাইকিয়াট্রিস্টের পরামর্শ নেওয়া। সঠিক থেরাপি ও কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে এই সমস্যা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব এবং এতে সম্পর্কের মাধুর্য আবার ফিরে আসে।
আপনার পার্টনারের মধ্যে কি এই লক্ষণগুলোর মিল পাচ্ছেন? কমেন্ট বক্সে আমাদের জানান। আর পোস্টটি শেয়ার করে আপনার বন্ধুদেরও সচেতন করুন!
লেখকঃ প্রফেসর, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। ইমেলঃ [email protected] হোয়াটস এপস নং- ০১৭১২২৭৪৮০৬


