বয়স বাড়লে স্মৃতিশক্তি কমবে—এটাই প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম বলে আমরা জানি। কিন্তু এমন কিছু মানুষ আছেন যাদের বয়স ৮০ ছাড়িয়ে গেলেও তাদের বুদ্ধিবৃত্তি এবং স্মৃতিশক্তি ঠিক ৫০ বা ৬০ বছর বয়সীদের মতোই তুখোড় থাকে। বিজ্ঞানীদের ভাষায় এদের বলা হয় ‘সুপার-এজার’ (SuperAgers)। দীর্ঘ ২৫ বছরেরও বেশি সময় গবেষণার পর নর্থওয়েস্টার্ন মেডিসিনের বিজ্ঞানীরা অবশেষে উন্মোচন করেছেন এই রহস্য। গত ২৩ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে ‘সায়েন্স ডেইলি’-তে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
কারা এই ‘সুপার-এজার’?
সাধারণত ৮০ বছর বা তার বেশি বয়সী ব্যক্তিদের মধ্যে যাদের স্মৃতিশক্তি ৫০ থেকে ৬০ বছর বয়সীদের স্তরে থাকে, গবেষকরা তাদেরই ‘সুপার-এজার’ হিসেবে চিহ্নিত করেন। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, অধিকাংশ মানুষ যখন বার্ধক্যজনিত কারণে আলঝেইমার্স বা ডিমেনশিয়ার দিকে ধাবিত হয়, এই বিশেষ একদল মানুষ তখন সম্পূর্ণ সুস্থ ও তীক্ষ্ণ মস্তিষ্কের অধিকারী থাকেন।
কেন তাদের স্মৃতিশক্তি এত প্রখর? বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা
নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ফেইনবার্গ স্কুল অফ মেডিসিনের অধ্যাপক ড. সান্ড্রা ওয়েনট্রাব এবং তার দল এই গবেষণায় দুটি প্রধান কারণ খুঁজে পেয়েছেন:
১. মস্তিষ্কের ‘রেজিস্ট্যান্স’ বা প্রতিরোধ ক্ষমতা
সুপার-এজারদের মস্তিষ্কে বার্ধক্যজনিত রোগ বা ডিমেনশিয়ার লক্ষণগুলো সহজে বাসা বাঁধতে পারে না। সাধারণত বয়সের সাথে সাথে মস্তিষ্কে কিছু প্রোটিন (Plaques and Tangles) জমা হয় যা আলঝেইমার্স রোগের কারণ। কিন্তু সুপার-এজারদের মস্তিষ্ক এই প্রোটিন জমা হওয়া প্রতিরোধ করতে সক্ষম।
২. মস্তিষ্কের ‘রেজিলিয়েন্স’ বা স্থিতিস্থাপকতা
কিছু সুপার-এজারের মস্তিষ্কে হয়তো সামান্য ক্ষতিকর প্রোটিন জমা হয়, কিন্তু তাদের মস্তিষ্কের কোষগুলো এতটাই শক্তিশালী যে সেই বিষাক্ত প্রোটিনগুলো স্মৃতিশক্তির কোনো ক্ষতি করতে পারে না। অর্থাৎ তাদের মস্তিষ্ক প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের কার্যক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে পারে।
জীবতাত্ত্বিক অনন্য বৈশিষ্ট্য
বিজ্ঞানীরা মৃত সুপার-এজারদের মস্তিষ্ক দান করার পর সেগুলো ল্যাবে পরীক্ষা করে কিছু বিশেষ কোষের সন্ধান পেয়েছেন:
- ভন ইকোনোমো নিউরন (Von Economo Neurons): সুপার-এজারদের মস্তিষ্কে এই বিশেষ ধরনের নিউরন প্রচুর পরিমাণে পাওয়া গেছে। এই কোষগুলো সামাজিক আচরণ এবং উচ্চতর বুদ্ধিবৃত্তিক কাজের সাথে যুক্ত।
- বৃহত্তর এন্টোরিনাল নিউরন: মস্তিষ্কের স্মৃতি কেন্দ্রের (Entorhinal Cortex) কোষগুলো সাধারণ মানুষের চেয়ে সুপার-এজারদের ক্ষেত্রে অনেক বড় এবং সুস্থ থাকে।
- ক্লান্তিহীন কর্টেক্স: সাধারণত বয়সের সাথে মস্তিষ্কের বাইরের স্তর বা কর্টেক্স পাতলা হয়ে যায় যাকে ব্রেইন শ্রিঙ্কেজ’ বলে । কিন্তু সুপার-এজারদের কর্টেক্স অনেক যুবকদের মতোই পুরু থাকে।
সামাজিক যোগাযোগ এবং লাইফস্টাইল
গবেষণায় দেখা গেছে, কেবল জিনগত কারণ নয়, এই সুপার-এজারদের জীবনযাপন পদ্ধতিও কিছুটা ভিন্ন। ক) গভীর সামাজিক সম্পর্ক: তারা অত্যন্ত সামাজিক এবং বহির্মুখী স্বভাবের হয়ে থাকেন। বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়া, সামাজিক কাজে অংশ নেওয়া এবং মানসিকভাবে সক্রিয় থাকা তাদের মস্তিষ্কের বয়স কমিয়ে রাখতে সাহায্য করে। খ) মানসিক চ্যালেঞ্জ: তারা অবসরের পর হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকেন না। নতুন কোনো ভাষা শেখা, বাদ্যযন্ত্র বাজানো বা জটিল ধাঁধা সমাধানের মতো কাজ তারা নিয়মিত করেন। গ) শারীরিক সক্রিয়তা: প্রতিদিনের হাঁটাচলা মস্তিষ্কের রক্ত সঞ্চালন সচল রাখে এবং কোষের অকাল মৃত্যু রোধ করে।
ডিমেনশিয়া চিকিৎসায় নতুন আশা
এই গবেষণার গুরুত্ব অপরিসীম। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, সুপার-এজারদের মস্তিষ্কের এই বিশেষ গুণগুলো যদি কৃত্রিমভাবে বা ওষুধের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে আনা সম্ভব হয়, তবে আলঝেইমার্স বা ডিমেনশিয়া প্রতিরোধের নতুন পথ খুলবে। এটি কেবল বার্ধক্য ঠেকানোর লড়াই নয়, বরং শেষ বয়স পর্যন্ত সম্মান এবং সুস্থ মস্তিষ্কের সাথে বেঁচে থাকার এক অনন্য বিজ্ঞান।
উপসংহার
বার্ধক্য মানেই স্মৃতিভ্রম নয়—সুপার-এজাররা আমাদের এটাই মনে করিয়ে দিচ্ছেন। সঠিক সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখা এবং মস্তিষ্কের এই জীবতাত্ত্বিক বিশেষত্বগুলো বুঝে উঠতে পারলে ভবিষ্যতে হয়তো আমরা সবাই বার্ধক্যকেও জয় করতে পারব।
তথ্যসূত্র:
- ScienceDaily: “These 80-year-olds have the memory of 50-year-olds. Scientists now know why.” (April 23, 2026).
- Northwestern University, Feinberg School of Medicine.


