ঢাকা, ২২ জুন, ২০২৬: বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে মানুষের মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা হ্রাস পাওয়া এবং স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়াকে এতদিন প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম বলে গণ্য করা হলেও, নতুন এক গবেষণায় তা সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য বলে দাবি করেছেন মার্কিন রোগতত্ত্ব ও স্নায়ুবিজ্ঞানীরা। সম্প্রতি ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের (University of Florida) গবেষকদের দ্বারা পরিচালিত একটি যুগান্তকারী গবেষণায় দেখা গেছে, দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মাত্র ৪টি সাধারণ অথচ অত্যন্ত প্রভাবশালী অভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে মস্তিষ্কের প্রকৃত বয়স (Brain Age) বাস্তব বয়সের চেয়ে প্রায় ৮ বছর পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব।
উন্নত নিউরোইমেজিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত এমআরআই (MRI) প্রযুক্তির সমন্বয়ে পরিচালিত এই গবেষণায় বিজ্ঞানীদের মূল লক্ষ্য ছিল—মানুষের দৈনন্দিন মানসিক অবস্থা ও আচরণ কীভাবে তার মস্তিষ্কের জৈবিক বার্ধক্যের (Biological Aging) ওপর প্রভাব ফেলে তা নিরূপণ করা। বিশেষ করে যারা দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক ব্যথায় (Chronic Pain) ভুগছেন, তাদের ক্ষেত্রে এই অভ্যাসগুলোর প্রভাব ছিল বিস্ময়কর। দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা সাধারণত মস্তিষ্কের গ্রে-ম্যাটার বা ধূসর উপাদান দ্রুত ক্ষয় করে বার্ধক্য ত্বরান্বিত করে। তবে গবেষকরা দেখেছেন যে, নির্দিষ্ট কিছু ইতিবাচক জীবনধারা এই ক্ষয় তো রোধ করেই, উল্টো মস্তিষ্ককে পুনরুজ্জীবিত করে তোলে।
চলুন জেনে নেওয়া যাক বিজ্ঞানীদের চিহ্নিত করা সেই ৪টি জাদুকরী অভ্যাস সম্পর্কে:
১. ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও আশাবাদ (Optimism)
গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, যারা জীবনের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন, তাদের মস্তিষ্কের কোষের ক্ষয়ের হার সাধারণ মানুষের তুলনায় বহুলাংশে কম। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, আশাবাদ মূলত কর্টিসল (Cortisol) নামক ক্ষতিকারক স্ট্রেস হরমোনের নিঃসরণ কমিয়ে দেয়। অতিরিক্ত কর্টিসল মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাস (Hippocampus) অংশকে সংকুচিত করে ফেলে, যা আমাদের নতুন স্মৃতি তৈরি ও ধরে রাখার জন্য দায়ী। প্রতিদিনের ভালো ঘটনাগুলোর প্রতি মনোযোগ দেওয়া এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অভ্যাস মস্তিষ্কে ডোপামিন ও সেরোটোনিনের মতো ‘ফিল-গুড’ নিউরোট্রান্সমিটারের প্রবাহ বৃদ্ধি করে, যা মস্তিষ্ককে দীর্ঘ সময় তরুণ ও সতেজ রাখে।
২. গভীর ও ক্লান্তি দূরকারী ঘুম (Restorative Sleep)
গবেষকরা ঘুমকে মস্তিষ্কের “প্রাকৃতিক বর্জ্য নিষ্কাশন প্রক্রিয়া” বা গ্লিমফ্যাটিক সিস্টেম (Glymphatic System) হিসেবে বর্ণনা করেছেন। যখন আমরা গভীর ঘুমে বা স্লো-ওয়েভ স্লিপে থাকি, তখন মস্তিষ্ক সারাদিনের জমে থাকা ক্ষতিকর টক্সিন ও বিটা-অ্যামাইলয়েড প্রোটিন ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে ফেলে। এই প্রোটিনটি মূলত আলঝেইমার্স রোগের জন্য দায়ী। বিজ্ঞানীদের মতে, প্রতিদিন ৭ থেকে ৮ ঘণ্টার মানসম্মত ও নিরবচ্ছিন্ন ঘুম মস্তিষ্কের বয়স প্রায় ৩ বছর পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে। এর জন্য শয়নকক্ষ সম্পূর্ণ অন্ধকার ও শান্ত রাখা এবং ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে নীল আলো নিঃসরণকারী ডিভাইস (মোবাইল, ল্যাপটপ) থেকে দূরে থাকার মতো ‘স্লিপ হাইজিন’ মেনে চলা জরুরি।
৩. শক্তিশালী সামাজিক যোগাযোগ (Strong Social Ties)
একাকীত্বকে আধুনিক যুগের অন্যতম বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন চিকিৎসকরা। গবেষণায় দেখা গেছে, পরিবার, বন্ধুবান্ধব এবং সামাজিক সংগঠনের সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত ব্যক্তিদের মস্তিষ্ক একাকী থাকা ব্যক্তিদের চেয়ে অনেক বেশি সক্রিয়। নিয়মিত সামাজিক মিথস্ক্রিয়া, আড্ডা ও গঠনমূলক আলোচনা মস্তিষ্কের নিউরাল নেটওয়ার্ককে উদ্দীপিত করে এবং নতুন মস্তিষ্কের কোষ (Neurogenesis) তৈরিতে সহায়তা করে। বিজ্ঞানীদের মতে, একাকীত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা মস্তিষ্কের বার্ধক্যকে প্রায় ৪ বছর পর্যন্ত ত্বরান্বিত করতে পারে, যা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে সম্পূর্ণ এড়ানো সম্ভব।
৪. সঠিক মানসিক চাপ ব্যবস্থাপনা (Stress Management)
বিজ্ঞানীদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ বা ক্রনিক স্ট্রেস মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে, যা আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আবেগ এবং মনোযোগের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করে। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত মাইন্ডফুলনেস ধ্যান (Meditation), যোগব্যায়াম, কিংবা গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম (Deep Breathing) করেন, তাদের মস্তিষ্কের গঠনগত ঘনত্ব বা গ্রে-ম্যাটারের পরিমাণ অনেক উন্নত থাকে। মানসিক চাপকে ইতিবাচকভাবে মোকাবিলা করার ক্ষমতা মস্তিষ্কের কোষের অকাল ক্ষয় ও মৃত্যু রোধ করে।
অভ্যাসের প্রভাব ও মস্তিষ্কের বয়স কমার তুলনামূলক চিত্র:
| অভ্যাসের ধরণ | মস্তিষ্কের ওপর প্রধান প্রভাব | সম্ভাব্য বয়স হ্রাস (বছরে) |
| ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও আশাবাদ | স্ট্রেস হরমোন কর্টিসল হ্রাস এবং হিপোক্যাম্পাস সুরক্ষা | ১.৫ – ২.০ বছর |
| গভীর ও ক্লান্তি দূরকারী ঘুম | গ্লিমফ্যাটিক সিস্টেম সক্রিয়করণ এবং টক্সিন নিষ্কাশন | ২.৫ – ৩.০ বছর |
| শক্তিশালী সামাজিক যোগাযোগ | নিউরাল নেটওয়ার্ক উদ্দীপনা ও নিউরোজেনেসিস বৃদ্ধি | ২.০ – ২.৫ বছর |
| সঠিক মানসিক চাপ ব্যবস্থাপনা | প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের সংকোচন রোধ ও কোষ সুরক্ষা | ১.০ – ১.৫ বছর |
গবেষক দলের প্রধানের বক্তব্য
গবেষক দলের প্রধান ড. ডাং ট্রিন (Dung Trinh) এক বিবৃতিতে বলেন, “আমরা হয়তো আমাদের বংশগত জিনগত গঠন (Genetics) বা জন্ম সনদের আসল বয়স পরিবর্তন করতে পারব না। তবে আমাদের ঘুম, মানসিক চাপ ব্যবস্থাপনা এবং সামাজিক যোগাযোগের মতো বিষয়গুলো সম্পূর্ণ আমাদের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণে। আজ থেকেই এই সাধারণ অভ্যাসগুলো রপ্ত করতে পারলে বার্ধক্যেও একটি দীর্ঘায়ু, তীক্ষ্ণ ও সম্পূর্ণ সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী হওয়া সম্ভব।”
অতিরিক্ত কিছু সুরক্ষামূলক দিকনির্দেশনা
মূল ৪টি অভ্যাসের পাশাপাশি ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছেন:
- ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য বর্জন: তামাকের নিকোটিন মস্তিষ্কের ক্ষুদ্র রক্তনালীগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং স্বাভাবিক রক্ত ও অক্সিজেন সঞ্চালন ব্যাহত করে কোষের দ্রুত মৃত্যু ঘটায়।
- স্বাস্থ্যকর শরীরের ওজন বজায় রাখা: অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা শরীরে এবং মস্তিষ্কে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ (Inflammation) তৈরি করে, যা আলঝেইমার্স এবং ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
দেশের শীর্ষস্থানীয় নিউরোলজিস্টদের মতে, এই গবেষণাটি আলঝেইমার্স বা ডিমেনশিয়ার মতো মারাত্মক নিউরোডিজেনারেটিভ রোগ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করল। চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনের দামি ওষুধের বাইরেও যে মানুষের নিজস্ব দৈনন্দিন অভ্যাসই তার মস্তিষ্কের পরম বন্ধু হতে পারে, এই প্রতিবেদনটি তারই চূড়ান্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ।
তাই আজ থেকেই আপনার দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় এই সামান্য কিছু পরিবর্তন আনুন এবং আপনার মস্তিষ্ককে রাখুন চিরসবুজ ও চিরতরুণ!


