spot_img

বিষণ্ণতার নেপথ্যে মস্তিষ্কের রহস্যময় কোষ: মানসিক স্বাস্থ্যের চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত

মানসিক রোগ বা বিষণ্ণতা (Depression) নিয়ে আমাদের সমাজে এখনো অনেক ভুল ধারণা প্রচলিত। অনেকেই একে নিছক অলসতা বা মনের দুর্বলতা বলে মনে করেন। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান বলছে ভিন্ন কথা। সম্প্রতি ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটি এবং ডগলাস ইনস্টিটিউট-এর এক গবেষণায় উঠে এসেছে অত্যন্ত চমকপ্রদ তথ্য। প্রথমবারের মতো বিজ্ঞানীরা ডিপ্রেশনের পেছনে দায়ী মস্তিষ্কের সুনির্দিষ্ট কিছু কোষ শনাক্ত করতে পেরেছেন। ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে প্রকাশিত এই গবেষণাটি বিষণ্ণতার চিকিৎসায় এক নতুন বিপ্লব আনতে যাচ্ছে।

বিষণ্ণতা কি কেবল আবেগীয় সমস্যা?

দীর্ঘদিন ধরে ডিপ্রেশনকে মূলত আবেগ এবং মনস্তাত্ত্বিক অবস্থার পরিবর্তন হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু গত কয়েক দশকের নিউরোসায়েন্স গবেষণা বলছে, বিষণ্ণতা আসলে মস্তিষ্কের একটি জৈবিক জটিলতা। সম্প্রতি সায়েন্স ডেইলিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিপ্রেশনে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মস্তিষ্কের গঠন বা কার্যক্রম সুস্থ মানুষের চেয়ে ভিন্ন হয়। তবে এবারের গবেষণার বিশেষত্ব হলো, বিজ্ঞানীরা এখন সরাসরি আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে পারছেন ঠিক কোন কোষগুলো (Cell types) এই সমস্যার জন্য দায়ী।

গবেষণার মূল ভিত্তি: দান করা মস্তিষ্কের টিস্যু

এই যুগান্তকারী গবেষণার জন্য বিজ্ঞানীরা ব্যবহার করেছেন Douglas-Bell Canada Brain Bank-এর সংরক্ষিত মস্তিষ্কের টিস্যু। এটি বিশ্বের অন্যতম একটি সংগ্রহশালা যেখানে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিদের মৃত্যুর পর দান করা মস্তিষ্ক সংরক্ষিত থাকে। ৫৯ জন বিষণ্ণতায় আক্রান্ত ব্যক্তি এবং ৪১ জন সুস্থ ব্যক্তির মস্তিষ্কের কোষ বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা এই পার্থক্যের প্রমাণ পেয়েছেন।

নেপথ্যের দুই প্রধান নায়ক: নিউরন এবং মাইক্রোগ্লিয়া

বিজ্ঞানীরা উন্নত জেনেটিক টুলের মাধ্যমে হাজার হাজার একক কোষের আরএনএ (RNA) এবং ডিএনএ (DNA) পরীক্ষা করেছেন। এই পরীক্ষায় দুই ধরনের কোষের অস্বাভাবিক আচরণ ধরা পড়েছে:

১. এক্সাইটেটরি নিউরন (Excitatory Neurons)

এই নিউরনগুলো আমাদের মস্তিষ্কের প্রধান যোগাযোগ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে। এগুলো মূলত মেজাজ বা মুড রেগুলেশন এবং মানসিক চাপের (Stress) বিরুদ্ধে সাড়া দিতে সাহায্য করে। গবেষণায় দেখা গেছে, ডিপ্রেশনে আক্রান্ত ব্যক্তিদের এই নিউরনগুলোর জিনগত সক্রিয়তা সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক আলাদা। অর্থাৎ, চাপের মুখে এই কোষগুলো যেভাবে কাজ করার কথা, তা করতে পারে না, যা ব্যক্তিকে দীর্ঘস্থায়ী বিষণ্ণতার দিকে ঠেলে দেয়।

২. মাইক্রোগ্লিয়া (Microglia)

মাইক্রোগ্লিয়া হলো মস্তিষ্কের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার অংশ বা ইমিউন সেল। এদের প্রধান কাজ হলো মস্তিষ্কের কোনো ইনফ্লামেশন বা প্রদাহ হলে তা দূর করা এবং নিউরনগুলোর যত্ন নেওয়া। গবেষণায় দেখা গেছে, বিষণ্ণ ব্যক্তিদের মাইক্রোগ্লিয়া কোষগুলো সঠিকভাবে কাজ করছে না। যখন মস্তিষ্কের ইমিউন সিস্টেমে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়, তখন তা সরাসরি মানুষের চিন্তাভাবনা এবং আচরণের ওপর প্রভাব ফেলে।

জৈবিক ভিত্তি বনাম সামাজিক কুসংস্কার

ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এবং এই গবেষণার প্রধান গবেষক ডা. গুস্তাভো টুরেকি বলেন, এই প্রথমবারের মতো আমরা ম্যাপ করতে পেরেছি কোন নির্দিষ্ট কোষগুলো ডিপ্রেশনের জন্য দায়ী। এটি প্রমাণ করে যে বিষণ্ণতা কেবল আবেগীয় বিষয় নয়, বরং এটি মস্তিষ্কের বাস্তব এবং পরিমাপযোগ্য পরিবর্তন।”

এই আবিষ্কারটি সমাজের প্রচলিত কুসংস্কার ভাঙতে সাহায্য করবে। মানুষ যখন জানতে পারবে যে এর পেছনে জৈবিক কারণ রয়েছে, তখন রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসায় অবহেলা করার প্রবণতা কমে আসবে।

চিকিৎসার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

এখন পর্যন্ত ডিপ্রেশনের চিকিৎসার জন্য যে অ্যান্টি-ডিপ্রেসেন্ট ওষুধগুলো ব্যবহার করা হয়, সেগুলো সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে কাজ করে না। কারণ, সেগুলোর কার্যকারিতা ছিল সাধারণ পর্যায়ের। কিন্তু এখন বিজ্ঞানীরা যখন সুনির্দিষ্ট কোষের সমস্যাগুলো জানেন, তখন তারা এমন ওষুধ তৈরির চেষ্টা করবেন যা সরাসরি ওই নির্দিষ্ট নিউরন বা মাইক্রোগ্লিয়া কোষকে টার্গেট করবে। একে বলা হয় টার্গেটেড থেরাপি। এর ফলে চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কমবে এবং নিরাময়ের হার বহুগুণ বেড়ে যাবে।

গবেষণার অর্থায়ন এবং প্রকাশনা

এই গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাটি বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী Nature Genetics-এ প্রকাশিত হয়েছে। এতে অর্থায়ন করেছে কানাডিয়ান ইনস্টিটিউটস অফ হেলথ রিসার্চ এবং ব্রেইন কানাডা ফাউন্ডেশনের মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলো।

শেষ কথা

বিজ্ঞানের এই জয়যাত্রা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ডিপ্রেশন কোনো কাল্পনিক সমস্যা নয়। শরীরের অন্য অঙ্গের মতো মস্তিষ্কেরও অসুখ হতে পারে। এই নতুন আবিষ্কারটি বিশ্বজুড়ে ২৬ কোটিরও বেশি বিষণ্ণতায় আক্রান্ত মানুষের জন্য আশার আলো হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভবিষ্যতে হয়তো এমন এক সময় আসবে যখন ডিপ্রেশন হবে খুব সহজে নিরাময়যোগ্য একটি শারীরিক অসুস্থতা।

তথ্যসূত্র:

  • McGill University (April 23, 2026). “For the first time, scientists pinpoint the brain cells behind depression.” ScienceDaily.
  • Chawla, A., & Turecki, G. et al. (2025). “Single-nucleus chromatin accessibility profiling identifies cell types and functional variants contributing to major depression.” Nature Genetics.

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

0FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles