spot_img

প্রতিযোগিতার যাঁতাকল: আমরা কি মেধা নাকি ‘রেসের ঘোড়া’ তৈরি করছি?

আজকের বাবা-মা, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়মিত কাজ করতে গিয়ে একটি প্রশ্ন বারবার সামনে আসে—আমরা কি সত্যিই শিক্ষিত হচ্ছি, নাকি কেবল দৌড়ে জেতার জন্য তৈরি হচ্ছি? নম্বর, র‍্যাঙ্কিং, ভর্তি পরীক্ষা, চাকরির প্রতিযোগিতা—সবকিছু মিলিয়ে পড়াশোনা যেন এক অবিরাম দৌড়। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে অনেক সময় “Hyper-competitive Parenting” বা অতিরিক্ত প্রতিযোগিতামূলক অভিভাবকত্ব বলা হয়। এই দৌড়ে পিছিয়ে পড়ার ভয় আমাদের মনোজগতে এমনভাবে ঢুকে গেছে যে শিক্ষা অনেক সময় মানবিকতা, কৌতূহল ও সৃজনশীলতার জায়গা দখল করে নিচ্ছে। মনোবিজ্ঞানের আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে আমরা বুঝতে পারি—সমস্যাটি কেবল শিক্ষাব্যবস্থার নয়; এটি আমাদের সামাজিক মনোভাব, পারিবারিক প্রত্যাশা এবং ব্যক্তিগত আত্মমূল্যবোধের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।

১. পারফরম্যান্স অ্যাংজাইটিবা ফলাফল-কেন্দ্রিক ভীতি

একজন শিক্ষার্থীর মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত নতুন কিছু শেখা (Mastery Orientation)। কিন্তু যখন সমাজ ও পরিবার শুধু ‘এ প্লাস’ বা ‘গোল্ডেন প্লাস’ পাওয়ার ওপর গুরুত্ব দেয়, তখন শিক্ষার্থীর মধ্যে Performance Orientation তৈরি হয়। তখন জানার চেয়ে যেকোনো উপায়ে ভালো স্কোর করাই একজন শিক্ষার্থীর মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়।

শিশু মনে করে তার নিজের কোনো মূল্য নেই, তার মূল্য কেবল তার রেজাল্ট শিটের নম্বরে। ফলে এরা সবসময় ভালো করার প্রচণ্ড চাপ অনুভব করে যার থেকে শিক্ষার্থীর মনে তীব্র পরীক্ষা-ভীতি ও উদ্বেগের জন্ম হয়। এর ফলে তাদের মধ্যে তীব্র ‘পারফরম্যান্স অ্যাংজাইটি’ তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি ঘটায়।

২. সৃজনশীলতার মৃত্যু ও কগনিটিভ রিজিডিটি

আমাদের মস্তিষ্ক তখন সবচেয়ে ভালো কাজ করে যখন সে স্বাচ্ছন্দ্যে থাকে। কিন্তু ক্রমাগত প্রতিযোগিতার চাপ মস্তিষ্কের Prefrontal Cortex-এর (যা চিন্তাশক্তি ও সৃজনশীলতা নিয়ন্ত্রণ করে) স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত করে।

  • রেসের ঘোড়া বনাম মানুষ: ঘোড়াকে যেমন দুপাশে ঠুলি পরিয়ে শুধু সামনের দিকে দৌড়াতে বাধ্য করা হয়, আমাদের শিক্ষার্থীরাও তেমনি শুধু সিলেবাস আর সাজেশনের গণ্ডিতে বন্দি হয়ে পড়ছে। এতে তাদের মধ্যে Cognitive Rigidity বা চিন্তার জড়তা তৈরি হচ্ছে, যার ফলে তারা পাঠ্যবইয়ের বাইরের বাস্তব সমস্যা সমাধানে অক্ষম হয়ে পড়ছে।

৩. সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও সহমর্মিতার অভাব

শিক্ষা ব্যবস্থার এই ‘রেস’ শিক্ষার্থীদের শেখাচ্ছে তার সহপাঠী বন্ধু নয়, বরং একজন প্রতিযোগী যাকে হারাতে হবে। মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় Zero-sum Game মানসিকতা। অর্থাৎ, “অন্যের ক্ষতি বা পরাজয়ই আমার জয়”।

এই মানসিকতা নিয়ে বড় হওয়া শিশুরা ভবিষ্যতে সহমর্মিতা (Empathy) হারায় এবং সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এটি শহর ও গ্রাম উভয় অঞ্চলের কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে একাকীত্ব ও বিষণ্ণতা বাড়াচ্ছে।

৪. ডোপামিন লুপ ও সাফল্যের মিথ্যা সংজ্ঞা

আজকের যুগে সাফল্যকে সংজ্ঞায়িত করা হচ্ছে সাময়িক বাহবা বা ‘লাইক’ দিয়ে। ভালো রেজাল্ট করলে উপহার বা প্রশংসা পাওয়া—এই Reward-based system শিশুদের মস্তিষ্কে ডোপামিনের একটি সাময়িক ঢেউ তৈরি করে। যখনই কোনো কারণে এই সাফল্যের গ্রাফ নিচে নামে, তখনই তারা তীব্র হতাশায় ভোগে। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরীক্ষার ফলাফলের পর শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার হার বাড়ার পেছনে এই ‘অল অর নাথিং’ (All or Nothing) মানসিকতা দায়ী।

৫. অভিভাবক ও সমাজের ভূমিকা: প্রজেকশনবা ছায়া-ইচ্ছা

অনেক সময় অভিভাবকরা নিজের জীবনের অপূর্ণ স্বপ্নগুলো সন্তানের মাধ্যমে পূরণ করতে চান। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় Psychological Projection। শহরে এটি হয়তো নামী স্কুল বা কোচিং নির্ভর, আর গ্রামে এটি বিসিএস বা সরকারি চাকরির নিশ্চয়তা কেন্দ্রিক। রূপটি ভিন্ন হলেও উভয় ক্ষেত্রেই সন্তানের নিজস্ব ভালো লাগা বা বিশেষ দক্ষতাকে (যেমন: ছবি আঁকা, খেলাধুলা বা কারিগরি দক্ষতা) নির্মমভাবে বিসর্জন দেওয়া হচ্ছে।

আমাদের করণীয়: উত্তরণের পথ

শিক্ষাকে ‘রেসের মাঠ’ থেকে বের করে এনে ‘জীবনমুখী’ ও আনন্দময় করতে হলে আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক মনস্তত্ত্বে কিছু জরুরি পরিবর্তন আনা আবশ্যক।

  1. প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দেওয়া (Focus on Process, not Result): সন্তান কত নম্বর পেল বা কোন পজিশন পেল তা না জিজ্ঞেস করে, সে আজ নতুন কী জ্ঞান অর্জন করল, কী নিয়ে কৌতূহলী হলো বা সে কতটা প্রচেষ্টা চালিয়েছে, তার প্রশংসা করুন।
  2. তুলনা বন্ধ করা: মনোবিজ্ঞানে বলা হয়, “Comparison is the thief of joy”। আপনার সন্তানের তুলনা কেবল তার গতকালের সাথে হওয়া উচিত, প্রতিবেশীর সন্তানের সাথে নয়।
  3. ব্যর্থতাকে গ্রহণ করা শেখানো: ভুল করলে সমালোচনা বা শাস্তি না দিয়ে, তা নিয়ে মুক্ত আলোচনা করুন । ব্যর্থতা যে পরাজয় নয় বরং তথ্য এবং নতুন করে শেখার একটি ধাপ; এই মানসিকতা (Growth Mindset) শৈশব থেকেই গড়ে তুলতে হবে।
  4. আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা (EQ)ও অন্তর্ভুক্তি: পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি শিশুকে আবেগ নিয়ন্ত্রণ, ধৈর্য এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসা শেখানো জরুরি। একজন মেধাবী অপরাধীর চেয়ে একজন মাঝারি মেধার সুনাগরিক সমাজের জন্য অনেক বেশি কাম্য। শিক্ষকদেরও মনে রাখতে হবে, ক্লাসে শুধু প্রথম সারির শিক্ষার্থীদের মূল্য দিলে বাকিরা নিজেদের অযোগ্য ভাববে; তাই শিক্ষা হতে হবে সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক।

পরিশেষে বলা যায়, আমরা যদি আমাদের সন্তানদের শুধু ‘রেসের ঘোড়া’ বানাতে চাই, তবে হয়তো তারা দ্রুত দৌড়াতে শিখবে, কিন্তু জীবনের দীর্ঘ পথে তারা হোঁচট খেলে আর উঠে দাঁড়াতে পারবে না। তাই আসুন, সন্তানদের নম্বরের পেছনে না দৌড় করিয়ে তাদের মানসিক সুস্থতাকে অগ্রাধিকার দিই, যেন তারা কেবল সফল নয়—বরং একজন সুখী, সচেতন ও সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারে । আর এই সুন্দর পথচলার শুরু হোক প্রতিটি শিক্ষার্থীর নিজের ভেতরের একটি সহজ প্রশ্নের মাধ্যমে— “আমি কি সত্যিই কিছু শিখছি, নাকি শুধু অন্ধের মতো দৌড়াচ্ছি?”

লেখকঃ প্রফেসর, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

0FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles