spot_img

প্যারেটো নীতি: কম পরিশ্রমে ৮০% সাফল্য অর্জনের গোপন চাবিকাঠি

আপনি কি সারাদিন প্রচুর কাজ করার পরেও দিনশেষে অনুভব করেন যে আসলে তেমন কিছুই করা হয়নি? আপনি কি তথ্যের সমুদ্রে হারিয়ে যাচ্ছেন এবং আপনার মনোযোগ বা ফোকাস নষ্ট হচ্ছে? আমাদের চারপাশের জগত আজ অত্যন্ত জটিল এবং তথ্যে ভরপুর। এখানে প্রতিটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সব বিশ্লেষণ করার মতো সময় বা মানসিক শক্তি আমাদের নেই। এই মানসিক অবসাদ বা ‘ব্রেন স্ট্রেইন’ থেকে বাঁচতে এবং সত্যিকারের উৎপাদনশীল হতে আপনার প্রয়োজন একটি শক্তিশালী মনস্তাত্ত্বিক শর্টকাট। যার নাম ৮০/২০ নীতি বা প্যারেটো নীতি।

প্যারেটো নীতি আসলে কী?

সহজ কথায় বলতে গেলে, প্যারেটো নীতি অনুযায়ী আপনার করা ২০ শতাংশ কাজই আসলে আপনার জীবনের ৮০ শতাংশ ফলাফল বা সাফল্য এনে দেয় এটি কোনো কঠোর গাণিতিক নিয়ম নয়, বরং একটি পর্যবেক্ষণ যা জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে কাজ করে। থিবাউট মিউরিস তার “পাওয়ারফুল ফোকাস” বইতে দেখিয়েছেন যে, আমরা যদি আমাদের উচ্চ প্রভাববিস্তারকারী (High-impact) ২০ শতাংশ কাজ চিহ্নিত করতে পারি, তবে আমাদের উৎপাদনশীলতা কয়েক গুণ বেড়ে যায়।

কেন আমরা এই নীতিটি ব্যবহার করি? (মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ)

রবার্ট সিয়ালডিনি তার “Influence” বইতে দেখিয়েছেন যে, আধুনিক জীবনের দ্রুতগতির সাথে তাল মেলাতে আমরা প্রায়ই ক্লিক, হুয়ার” (click, whirr) নামক স্বয়ংক্রিয় প্রতিক্রিয়া ব্যবহার করি। এটি আমাদের মস্তিষ্কের একটি কৌশল বা শর্টকাট যা আমাদের দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। সভ্যতা এগিয়ে যায় সেই সব কাজের সংখ্যা বৃদ্ধির মাধ্যমে যা আমরা কোনো চিন্তা না করেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে করতে পারি ৮০/২০ নীতি ঠিক তেমনই একটি ‘মেন্টাল শর্টকাট’ হিসেবে কাজ করে, যা আমাদের অপ্রয়োজনীয় ৮০% কাজের বোঝা কমিয়ে মূল ২০% কাজে ফোকাস করতে বাধ্য করে।

ব্যবসায়িক এবং পেশাদার জীবনের উদাহরণ

থিবাউট মিউরিস নিজের জীবনের একটি বাস্তব উদাহরণ দিয়েছেন। লেখক হিসেবে তিনি লক্ষ্য করেছেন যে, তার সব কাজ সমান গুরুত্বপূর্ণ নয়। তার সাফল্যের পেছনে মূল তিনটি কাজ ছিল—ধারাবাহিকভাবে বই লেখা, অ্যামাজনে বিজ্ঞাপন দেওয়া এবং পাঠকদের সাথে যোগাযোগ রাখা তিনি যখন লক্ষ্য করলেন যে অন্য সব টুকিটাকি কাজ (যেমন: সারাদিন সোশ্যাল মিডিয়ায় থাকা বা লোগো ডিজাইন নিয়ে মেতে থাকা) তার তেমন কোনো সুদূরপ্রসারী ফলাফল দিচ্ছে না, তখন তিনি সেই অপ্রয়োজনীয় কাজগুলো কমিয়ে দিলেন।

সেথ গোডিন-এর একটি বিখ্যাত উদাহরণ মিউরিস তার বইতে উল্লেখ করেছেন: “এক কাঠঠোকরা যদি এক হাজারটি গাছে একবার করে ঠোকর দেয়, তবে সে কিছুই পাবে না। কিন্তু সে যদি একটি নির্দিষ্ট গাছে এক হাজার বার আঘাত করে, তবে সে খাবার বা সাফল্য পাবেই”। এটিই হলো ৮০/২০ নীতির মূল শক্তি; সবকিছু করার চেষ্টা না করে শুধুমাত্র প্রভাবশালী কাজে ফোকাস করা।

ফাঁদ থেকে সাবধান: ভালো অনুভূত হওয়া কাজবনাম কঠিন কাজ

আমরা অনেক সময় উৎপাদনশীল হওয়ার ভান করি। মিউরিসের মতে, আমরা প্রায়ই এমন সব কাজে সময় কাটাই যা আমাদের ভালো অনুভব‘ (feel-good activities) করায়, কিন্তু আসলে সেগুলো অনুৎপাদনশীল। যেমন: ঘণ্টার পর ঘণ্টা মেইল চেক করা বা অপ্রয়োজনীয় মিটিং করা।

বিপরীতে, ২০ শতাংশ উচ্চ প্রভাবশালী কাজগুলো সাধারণত কঠিন কাজ‘ (hard work) হয়ে থাকে এই কাজগুলো আপনার আয় বাড়াতে বা লক্ষ্যের দিকে সরাসরি এগিয়ে নিতে সাহায্য করে। আপনার মস্তিষ্ক হয়তো এই কঠিন কাজগুলো এড়িয়ে যাওয়ার জন্য হাজারটা অজুহাত দেখাবে (ক্লিক, হুয়ার প্রতিক্রিয়া), কিন্তু সফল হতে হলে আপনাকে এই মানসিক বাধা কাটিয়ে উঠতে হবে।

উৎপাদনশীলতা বাড়াতে ৩টি বাস্তবসম্মত কৌশল

১. উচ্চ প্রভাব বিস্তারকারী কাজ চিহ্নিত করুন: প্যারেটো নীতি অনুযায়ী, আপনার তালিকার মাত্র ২০% কাজ আপনার ৮০% সাফল্য এনে দেবে। তাই প্রতিদিন সকালে বা আগের দিন রাতে আপনার প্রতিদিনের কাজের তালিকা থেকে এমন ৩টি কাজ খুঁজে বের করুন যা আপনার দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যের জন্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ । এগুলোই আপনার ‘উচ্চ প্রভাবশালী’ ২০% কাজ। এই ৩টি মূল কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত অন্য সব কম গুরুত্বপূর্ণ কাজ তালিকার নিচে রাখুন বা দিনশেষে করার জন্য জমিয়ে রাখুন । সবকিছু একসাথে করার চেষ্টা না করে কেবল এই ৩টি মূল কাজে আপনার সমস্ত শক্তি ফোকাস করুন ।

২. শূন্যভিত্তিক চিন্তা (Zero-based Thinking):  শূন্যভিত্তিক চিন্তা হলো অতীতের ভুল সিদ্ধান্তের দায় থেকে নিজেকে মুক্ত করে, বর্তমানের সঠিক জ্ঞানের আলোতে জীবনের অপ্রয়োজনীয় ৮০% কাজের বোঝা কমিয়ে ফেলার একটি চমৎকার মনস্তাত্ত্বিক কৌশল।

নিজেকে একটি কঠিন প্রশ্ন করুন— “আজ আমি যা জানি, তা যদি আগে জানতাম, তবে কি এই কাজটি আজও নতুন করে শুরু করতাম?”। যদি উত্তর ‘না’ হয়, তবে সেই কাজটি আপনার জীবন থেকে চিরতরে মুছে ফেলুন। আমরা অনেক সময় অতীতের লোকসান বা মায়ার ফাঁদে পড়ে অনেক অনুৎপাদনশীল কাজ টেনে নিয়ে চলি।

উদাহরণ- ধরুন, অতীতে শুরু করা কোনো প্রজেক্ট থেকে এখন আর কোনো লাভ হচ্ছে না, উল্টো মানসিক শান্তি নষ্ট হচ্ছে। নিজেকে জিজ্ঞেস করুন: “আজ যা জানি, তা যদি আগে জানতাম, তবে কি নতুন করে এই কাজে হাত দিতাম?” উত্তর ‘না’ হলে বুঝতে হবে আপনি কেবল অতীতের মায়ায় কাজটি টেনে নিচ্ছেন; এটি এখনই আপনার জীবন থেকে বাদ দেওয়া উচিত।

৩. খালি কাগজের কৌশল: আপনার বর্তমান হিজিবিজি কাজের তালিকা ফেলে দিন। একটি একেবারে খালি কাগজ (Empty paper) নিন এবং সেখানে নতুন করে শুধুমাত্র সেই ২০% কাজের নাম লিখুন যা আপনাকে দীর্ঘমেয়াদী সাফল্য দেবে।

কেন এই কৌশলটি কাজ করবে তার বৈজ্ঞানিক ব্যখ্যা-

i) জ্ঞানীয় ওভারলোডহ্রাস এবং মস্তিষ্কের রিবুট: আমাদের মস্তিষ্কের ওয়ার্কিং মেমোরির তথ্য ধারণ ক্ষমতা সীমিত। যখন কাজের তালিকায় প্রচুর হিজিবিজি বা অপ্রয়োজনীয় কাজ জমা হয়, তখন মস্তিষ্ক ‘কগনিটিভ ওভারলোড’ বা মানসিক জটলায় ভোগে।

স্নায়ুবিজ্ঞান অনুযায়ী, পুরানো হিজিবিজি তালিকাটি ফেলে দেওয়া এবং একটি সম্পূর্ণ খালি কাগজ সামনে নেওয়া আমাদের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সকে (Prefrontal Cortex) একটি ‘রিমুভাল সিগন্যাল’ পাঠায়। এটি মস্তিষ্ককে বোঝায় যে পেছনের সব বিশৃঙ্খলা শেষ, এখন নতুন করে শুরু করার সময়।

ii) হাত ও মস্তিষ্কের সংযোগ: ‘জেনারেশন ইফেক্ট‘:  আজকের ডিজিটাল যুগে ল্যাপটপ বা মোবাইলের স্ক্রিনে তালিকা না করে কাগজে কলমে লিখুন।

মনস্তাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, টাইপ করার চেয়ে হাত দিয়ে কাগজে কলমে লিখলে (Handwriting) মস্তিষ্কের রেটিকুলার অ্যাক্টিভেটিং সিস্টেম (Raman & RAS) সক্রিয় হয়। হাত দিয়ে লেখার প্রক্রিয়াটি ব্রেইনের অনেক বেশি অংশকে উদ্দীপিত করে, যা সেই ২০% কাজের প্রতি আপনার মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। অবশ্য এক্ষেত্রে নীল কালির কলম ব্যবহার বেশি ফলপ্রসূ হয়ে থাকে।

iii)  ডোপামিন ট্রিগার এবং কাজের স্পষ্টতা: কাজের তালিকা যখন অনেক বড় হয়, তখন আমাদের মস্তিষ্ক ভয় পেয়ে যায় এবং অজুহাত খোঁজে । কিন্তু খালি কাগজে যখন মাত্র ২-৩টি বড় কাজ থাকে, তখন লক্ষ্য স্পষ্ট হয় ।

বিজ্ঞান বলে, লক্ষ্য যত সুনির্দিষ্ট এবং সংক্ষিপ্ত হয়, মস্তিষ্ক তত সহজে ‘ডোপামিন’ (Dopamine – কাজের প্রেরণা জোগানোর হরমোন) নিঃসরণ করে। বড় হিজিবিজি তালিকা দেখলে মস্তিষ্ক যে ‘কঠিন কাজ’ মনে করে পালিয়ে যেত, ছোট তালিকা দেখলে সেটিকে সে অর্জনযোগ্য মনে করে ।

খালি কাগজে শুধু কাজের নাম না লিখে, সেটির পাশে “কেন করব?” (The ‘Why’) এবং “কখন করব?” (Implementation Intentions) এই দুটি বৈজ্ঞানিক উপাদান যোগ করুন। যেমন: “সকাল ১০টায় ১ ঘণ্টা বই লিখব, কারণ এটি আমার দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য।”  মনস্তত্ত্ববিদ পিটার গোলউইটজারের মতে, এই ছোট বাক্যটি কাজ সম্পন্ন করার সম্ভাবনা ৩০০% পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়।

iv). জাইগারনিক ইফেক্ট থেকে মুক্তি: মনস্তত্ত্ববিদ ‘ব্লুমা জাইগারনিক’ আবিষ্কার করেন যে, আমাদের মস্তিষ্ক অসমাপ্ত বা হিজিবিজি কাজগুলোকে বারবার মনে করিয়ে দিয়ে ব্যাকগ্রাউন্ডে মানসিক শক্তি খরচ করতে থাকে (Mental Strain) ।

বিজ্ঞান বলে, খালি কাগজের কৌশলটি এই জেইগারনিক ইফেক্টকে থামিয়ে দেয় । অপ্রয়োজনীয় ৮০% কাজ যখন তালিকা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাদ পড়ে যায়, তখন মস্তিষ্ক ধরে নেয় এই কাজগুলোর আর কোনো অস্তিত্ব নেই । ফলে অবশিষ্ট সমস্ত শক্তি সেই মূল ২০% কাজে নিয়োগ করা সম্ভব হয়।

পরিশেষে বলা যায়, মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা মানুষের অন্যতম বড় সম্পদ। তথ্যের সমুদ্রে হারিয়ে যাওয়ার চেয়ে ২০% গুরুত্বপূর্ণ কাজে মনোযোগ দিয়ে ৮০% সাফল্য অর্জন করা অনেক বেশি বুদ্ধিমানের কাজ মনে রাখবেন, যারা এই মনস্তাত্ত্বিক ট্রিগার বা নীতিগুলো সম্পর্কে সচেতন, তারা সহজেই অন্যদের তুলনায় এগিয়ে থাকে। আপনি কি প্রস্তুত আপনার জীবনের সেই জাদুকরী ২০ শতাংশ কাজ খুঁজে বের করতে? আজই শুরু করুন এবং নিজের উৎপাদনশীলতাকে নিয়ে যান আকাশচুম্বী উচ্চতায়।

লেখকঃ প্রফেসর, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

0FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles