spot_img

পাবনা মানসিক হাসপাতাল: বাংলাদেশের মানসিক স্বাস্থ্যসেবার পথচলা

বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ইতিহাসে যে প্রতিষ্ঠানটি সবচেয়ে দীর্ঘদিন ধরে নীরবে কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে, সেটি হলো পাবনা মানসিক হাসপাতাল। ১৯৫৭ সালে যাত্রা শুরু করা এই হাসপাতাল শুধু দেশের একমাত্র সরকারি বিশেষায়িত মানসিক হাসপাতালই নয়, বরং এটি বাংলাদেশের মানসিক স্বাস্থ্যসেবার বিকাশ, সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাবনার একটি জীবন্ত দলিল। ছয় দশকের বেশি সময় ধরে হাজারো মানসিক রোগীর চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও আশ্রয়ের দায়িত্ব পালন করে আসা এই প্রতিষ্ঠানটি আজও মানবিকতা ও সংকট—দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার পথচলা অব্যাহত রেখেছে।

গাংগুলীর স্বপ্ন: একটি মানবিক উদ্যোগের সূচনা

১৯৫৭ সালে, তৎকালীন পাবনা জেলার সিভিল সার্জন মোহাম্মদ হোসেন গাংগুলী এক ব্যতিক্রমী স্বপ্ন দেখেছিলেন—বাংলাদেশের মানুষের জন্য একটি বিশেষায়িত মানসিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা। তিনি বরিশালের মানুষ হলেও পাবনার জন্য এই স্বপ্ন দেখেছিলেন, যা আজও হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা বোর্ডে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। শুরুর দিকে শহরের শীতলাই জমিদারবাড়িতে অস্থায়ীভাবে হাসপাতালের কার্যক্রম শুরু হয়। প্রথম বছরেই ৮০ জন রোগী ভর্তি হন, যাদের মধ্যে ৪০ জন চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন। এটি সে সময়ের জন্য এক যুগান্তকারী সাফল্য ছিল।

স্থায়ী অবকাঠামো: ১১১ একর জমির এক বিস্তৃত হাসপাতাল

হাসপাতালের আনুষ্ঠানিক যাত্রার পর দ্রুতই একটি স্থায়ী অবকাঠামোর প্রয়োজন দেখা দেয়। পাবনা সদর উপজেলার হিমাইতপুর ইউনিয়নে অধিগ্রহণ করা হয় ১১১.২৫ একর জমি। এই জমির একটি বড় অংশ ছিল পাবনার আধ্যাত্মিক সাধক শ্রীশ্রী ঠাকুর অনুকূল চন্দ্র–এর, যিনি তখন ভারতে অবস্থান করছিলেন। জমি অধিগ্রহণের অর্থ তাঁর ব্যাংক হিসাবে জমা দেওয়া হয়—যা আজও একটি ঐতিহাসিক কৌতূহল হিসেবে আলোচিত। ১৯৫৯ সালে হাসপাতালের মূল অবকাঠামো নির্মাণ শেষ হয়। বিশাল সবুজ প্রাঙ্গণ, প্রশস্ত করিডর আর নীরব পরিবেশ মানসিক চিকিৎসার জন্য এক অনন্য পরিসর তৈরি করে। অবশ্য বর্তমানে এই হাসপাতালের জায়গার পরিমান ৮১.২৫ একর (৩০ একর জায়গা পাবনা মেডিক্যাল কলেজকে হস্তান্তর করা হয়েছে)।

শয্যা ও চিকিৎসা ব্যবস্থার ক্রমবিকাশ

পাবনা মানসিক হাসপাতাল শুরু হয়েছিল মাত্র ৬০ শয্যা নিয়ে। পরবর্তীতে—

  • ১৯৬৬ সালে: ১৫০ শয্যা
  • এরপর: ২০০ শয্যা
  • ১৯৯৬ সালে: ৫০০ শয্যায় উন্নীত

বর্তমানে ৫০০ শয্যার মধ্যে ৩৫০টি সাধারণ (পুরুষ ২৭৫টি ও মহিলা ৭৫টি) ও ১৫০টি পেইং (পুরুষ ৭৫টি, মহিলা ৫০টি, এবং মাদকাসক্ত ২৫টি) শয্যা রয়েছে। অন্তর্বিভাগে একসঙ্গে ৪০০ জন পুরুষ ও ১০০ জন নারী চিকিৎসা নিতে পারেন। বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে ১২০–১৪০ জন রোগী সেবা গ্রহণ করেন।

চিকিৎসা দেওয়া হয় তিনটি প্রধান বিভাগে—

  1. অন্তর্বিভাগ
  2. বহির্বিভাগ
  3. বিনোদনমূলক/অকুপেশনাল থেরাপি বিভাগ

রোগীসেবা: পরিসংখ্যানের পেছনের মানবিক গল্প

পরিসংখ্যান অনুযায়ী—

  • ১৯৫৭–২০১৬ সাল পর্যন্ত ৭৯,৪৪৪ জন রোগী অন্তর্বিভাগে ভর্তি হন
  • ৬৬,৭৯০ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন
  • ২০০৯–২০১৬ সালে বহির্বিভাগে চিকিৎসা নেন ,৭৫,৫৫৬ জন রোগী

এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী রোগীও রয়েছেন, যা মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় নারীদের অংশগ্রহণ ও প্রয়োজনীয়তার দিকটি স্পষ্ট করে। তবে এই সাফল্যের আড়ালে রয়েছে কিছু হৃদয়বিদারক বাস্তবতা। বর্তমানে এমন বহু রোগী আছেন, যারা ২০–২৫ বছর আগেই সুস্থ হয়েছেন, কিন্তু স্বজনরা আর কখনো তাদের নিতে আসেননি। হাসপাতালই হয়ে উঠেছে তাদের একমাত্র পরিবার।

জনবল সংকট: দেশের একমাত্র মানসিক হাসপাতালের বড় চ্যালেঞ্জ

পাবনা মানসিক হাসপাতাল বর্তমানে বাংলাদেশের একমাত্র সরকারি বিশেষায়িত মানসিক হাসপাতাল। অথচ এখানেই রয়েছে সবচেয়ে ভয়াবহ জনবল সংকট। ৫ই অক্টোবর ২০২১ অনুযায়ী

  • অনুমোদিত চিকিৎসক পদ: ৩১
  • কর্মরত চিকিৎসক: মাত্র ১১
  • শূন্য পদ: ১৭

আবাসিক মেডিকেল অফিসার, ক্লিনিক্যাল সাইকিয়াট্রিস্ট, অ্যানেসথেটিস্ট, প্যাথলজিস্ট, বায়োকেমিস্ট—এমন গুরুত্বপূর্ণ পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। নার্স, সুইপার, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর ক্ষেত্রেও একই চিত্র। ৫০০ শয্যার হাসপাতাল হয়েও জনবল অনুমোদন রয়েছে মাত্র ২০০ শয্যার জন্য—যা কার্যত একটি কাঠামোগত বৈষম্য।

অবকাঠামো: আছে সব, নেই ব্যবহারযোগ্যতা

হাসপাতাল চত্বরে রয়েছে—

  • মোট ৫৩টি ভবন
  • রান্নাঘর, ধোপাঘর, সিনেমা হল
  • হস্তশিল্প ও তাঁত ভবন
  • আবাসিক কোয়ার্টার ও কটেজ

কিন্তু অধিকাংশ ভবনই এখন জরাজীর্ণ ও ব্যবহারের অনুপযোগী। বর্ষাকালে অনেক কক্ষে পানি ঢুকে পড়ে, যন্ত্রপাতি অকেজো, অনেক ক্ষেত্রে চালানোর লোক নেই।

মানবিক আলো: ব্রজ গোপাল সাহা ও অকুপেশন থেরাপি

এই হাসপাতালের মানবিক ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নাম ব্রজ গোপাল সাহা (কালা দা)। ১৯৬৬ সালে অকুপেশন থেরাপিস্ট হিসেবে যোগ দিয়ে ২০০০ সালে অবসর নিলেও তিনি হাসপাতাল ছাড়েননি। বিনা পারিশ্রমিকে আজও রোগীদের সঙ্গে সময় কাটান, খেলাধুলা ও বিনোদনের মাধ্যমে তাদের মানসিক সুস্থতায় ভূমিকা রাখেন।

তার ভাষায়, “হাসপাতালের প্রত্যেক রোগী আমার স্বজন। এই চত্বরই আমার বাড়ি।”

আধুনিকায়নের প্রচেষ্টা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

সব সংকটের মধ্যেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ নিয়েছে—

  • বহির্বিভাগের রোগীদের ১–২ মাসের ওষুধ সরবরাহ
  • রোগীদের তৈরি ব্যাগে ওষুধ দেওয়া
  • সিসিটিভি ক্যামেরা, সোলার লাইট
  • প্রতিটি কক্ষে সাউন্ড সিস্টেম ও টিভি
  • লাইব্রেরি, নারী রোগীদের জন্য পার্ক ও খেলাধুলার ব্যবস্থা

এক হাজার শয্যার নতুন হাসপাতাল ভবনের প্রস্তাবও রয়েছে, যদিও তা এখনো ফাইলবন্দি অবস্থায় আছে।

উপসংহার: পাবনা মানসিক হাসপাতাল কেন আমাদের সবার দায়

পাবনা মানসিক হাসপাতাল শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়—এটি বাংলাদেশের মানসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আয়না। এখানে যেমন আছে অবহেলা ও সংকট, তেমনি আছে মানবিকতা, ইতিহাস ও সম্ভাবনা। যদি যথাযথ জনবল নিয়োগ, অবকাঠামো সংস্কার ও নীতিগত গুরুত্ব দেওয়া যায়, তবে এই হাসপাতাল আবারও দক্ষিণ এশিয়ায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবার একটি মডেল হয়ে উঠতে পারে। মানসিক স্বাস্থ্য কোনো বিলাসিতা নয়—এটি মৌলিক অধিকার। আর সেই অধিকারের সবচেয়ে পুরোনো প্রহরী হলো পাবনা মানসিক হাসপাতাল

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

0FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles