spot_img

অহেতুক অতিরিক্ত মৃত্যুভয়ঃ থানাটোফোবিয়া

আমি গত এক দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের বিভিন্ন বয়সী ও পেশার মানুষের সাথে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করছি। সেই অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বলতে পারি—
মৃত্যুভয় থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু সেই ভয় যদি জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তখন সেটি আর সাধারণ ভয় থাকে না; তখন সেটি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হয়।

মনোবিজ্ঞানের ভাষায় অতিরিক্ত ও অযৌক্তিক মৃত্যুভয়কে বলা হয় থানাটোফোবিয়া (Thanatophobia)
গ্রিক শব্দ Thanatos (মৃত্যু) এবং Phobos (ভয়) থেকে শব্দটি এসেছে। এটি মূলত একটি Specific Phobia, অর্থাৎ নির্দিষ্ট কোনো বিষয়কে কেন্দ্র করে তীব্র ভয়, যা অনেক সময় Anxiety Disorder-এর অংশ হিসেবেও দেখা যায়। এটি কোনো সাধারণ ভয় নয়, বরং একটি মানসিক স্বাস্থ্যগত অবস্থা যেখানে ব্যক্তি নিজের মৃত্যু বা প্রিয়জনের মৃত্যুর কথা ভেবে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বাধাগ্রস্ত করে।

মৃত্যু ভীতির সাধারণ লক্ষণসমূহ:

  • সারাক্ষণ মৃত্যু নিয়ে দুশ্চিন্তা: নিজের বা প্রিয়জনের মৃত্যু নিয়ে অবসেসিভ বা বারবার চিন্তাভাবনা করা। অনিদ্রা বা রাতে মৃত্যুর দুঃস্বপ্ন দেখা।
  • প্যানিক অ্যাটাক: মৃত্যু বা মৃত্যুর প্রক্রিয়া (যেমন- কবরস্থান বা অসুস্থতা) নিয়ে ভাবলে তীব্র আতঙ্ক, শ্বাসকষ্ট, হৃদস্পন্দন বৃদ্ধি, ঘাম হওয়া, বুকে ব্যথা বা কাঁপুনি দেওয়া।
  • এড়িয়ে চলার প্রবণতা (Avoidance): মৃত্যু সম্পর্কিত যেকোনো জায়গা, বিষয়, বা আলোচনা এড়িয়ে চলা। সামাজিক অনুষ্ঠান বা লোকসমাগম এড়িয়ে চলা।
  • শারীরিক সমস্যা: মাথা ঘোরা, পেটে ব্যথা, বা বমি বমি ভাব।
  • ডিপ্রেশন ও উদ্বেগ: সবসময় ভয়ের মধ্যে থাকা এবং দৈনন্দিন কাজে মনোযোগ দিতে না পারা। অসুস্থ হয়ে পড়ার ভয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করা।

DSM-5 অনুযায়ী মৃত্যুভীতি (Fear of Death in DSM-5) 

আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশনের Diagnostic and Statistical Manual of Mental Disorders, Fifth Edition (DSM-5)-এ ‘থানাটোফোবিয়া’ নামে আলাদা কোনো রোগ হিসেবে এটি তালিকাভুক্ত নয়। তবে, একে “Specific Phobia” (সুনির্দিষ্ট ফোবিয়া)-এর অধীনে ধরা হয়। 

DSM-5 অনুযায়ী রোগটি চিহ্নিত করার শর্তসমূহ:

  • ভয়টি অবশ্যই অত্যধিক বা অযৌক্তিক হতে হবে।
  • এই ভয়ের কারণে ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট পরিস্থিতি বা চিন্তা এড়িয়ে চলতে হয়।
  • ভয়টি সাধারণত ৬ মাস বা তার বেশি সময় ধরে চলতে থাকে।
  • এটি সামাজিক বা কর্মক্ষেত্রে স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করে। 

৩. মৃত্যুভীতির বিভিন্ন ধরন (Types/Components of Fear of Death)

গবেষণায় মৃত্যুভীতিকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা যায়: 

  1. নিজের মৃত্যুভয় (Fear of one’s own death): নিজের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাওয়ার ভয়।
  2. অন্যের মৃত্যুভয় (Fear of the death of loved ones): প্রিয়জনদের হারানোর ভয়।
  3. মারা যাওয়ার প্রক্রিয়ার ভয় (Fear of the dying process): যন্ত্রণা, কষ্ট বা দীর্ঘস্থায়ী রোগভোগের ভয়।
  4. অজানার ভয় (Fear of the unknown): মৃত্যুর পর কী হবে—তা নিয়ে ভয়।
  5. নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয়: মৃত্যুর ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকার অনুভূতি। 

কারণসমূহ (Causes )

  • মানসিক আঘাতমূলক অভিজ্ঞতা (Traumatic Experiences): শৈশবে বা অতীতে কোনো নিকটাত্মীয়ের মৃত্যু দেখা বা নিজের প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার সম্মুখীন হওয়া এই ভীতির প্রধান কারণ হতে পারে।
  • গুরুতর অসুস্থতা: দীর্ঘস্থায়ী বা জীবনঘাতী রোগে (যেমন: হৃদরোগ, ক্যান্সার) আক্রান্ত হলে নিজের মৃত্যু সম্পর্কে অতিরিক্ত উদ্বেগ তৈরি হয়।
  • মানসিক স্বাস্থ্য ব্যাধি: প্যানিক ডিসঅর্ডার (Panic Disorder), ইলনেস অ্যাংজাইটি (Illness Anxiety) বা বিষণ্নতার (Depression) সাথে মৃত্যু ভীতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকে।
  • ধর্মীয় ও ব্যক্তিগত বিশ্বাস: পরকাল নিয়ে অনিশ্চয়তা বা মৃত্যু-পরবর্তী শাস্তি সম্পর্কে অতিরিক্ত চিন্তাও এই ভীতি বাড়িয়ে দেয়।
  • বয়স: গবেষণা অনুযায়ী, তরুণরা সাধারণত সরাসরি ‘মৃত্যু’কে ভয় পায়, অন্যদিকে বয়স্করা ‘মৃত্যুর প্রক্রিয়া’ বা কষ্টের ভয়ে বেশি ভোগেন।
  • পারিবারিক ইতিহাস: পরিবারে কারও তীব্র উদ্বেগ বা ফোবিয়া থাকলে উত্তরাধিকারসূত্রে বা অন্যদের দেখে এই রোগ হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। 
  • জীবনের অতৃপ্তি: নিজের জীবন অপূর্ণ মনে হওয়া। জীবনের উদ্দেশ্যহীনতা বা অর্থ খুঁজে না পাওয়া। নিজেকে নিয়ে অসন্তুষ্ট থাকা এবং আত্মমর্যাদার অভাব।

এই ভয় কাটানোর কিছু উপায়
মৃত্যু ভীতি বা ‘থানাটোফোবিয়া’ (Thanatophobia) কাটিয়ে ওঠার জন্য কিছু কার্যকর স্বনির্ভর কৌশল বা সেলফ-হেল্প স্ট্র্যাটেজি নিচে দেওয়া হলো:

১. ভয়কে স্বীকার করা: মৃত্যু একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। জন্ম নিলে মৃত্যু অনিবার্য—এই চিরন্তন সত্যটি মানসিকভাবে মেনে নেওয়ার চেষ্টা করা। এটি নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা না করে ভয়টিকে গ্রহণ করুন। ভয় লুকিয়ে রাখলে তা আরও বাড়ে। 

২. বর্তমান মুহূর্তে বাঁচুন (Mindfulness): ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে বর্তমান কাজ ও মুহূর্তের ওপর গুরুত্ব দিন। মেডিটেশন বা শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম (Deep Breathing) মনকে শান্ত রাখতে সাহায্য করে।

৩. জ্ঞানার্জন ও দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন: জীবন এবং মৃত্যুর বৈজ্ঞানিক ও আধ্যাত্মিক দিকগুলো নিয়ে পড়াশোনা করুন। অনেক সময় অনিশ্চয়তা থেকেই ভয়ের সৃষ্টি হয়; সঠিক তথ্য জানলে মনের ভয় কমে।

৪. জীবনকে অর্থবহ করা: নিজের শখ, প্রিয় মানুষ এবং সমাজসেবামূলক কাজে সময় দিন। যখন আপনি একটি লক্ষ্যপূর্ণ জীবন কাটাবেন, তখন মৃত্যুর চেয়ে জীবনের সার্থকতা বড় হয়ে দেখা দেবে।

৫. স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন: নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং পুষ্টিকর খাবার মস্তিষ্ককে শান্ত রাখতে সাহায্য করে। শারীরিক সুস্থতা মানসিক দুশ্চিন্তা কমাতে সরাসরি প্রভাব ফেলে। 

৬. নেতিবাচক চিন্তা থেকে দূরে থাকা: মৃত্যু সম্পর্কিত সংবাদ, সিনেমা বা আলোচনা যা আপনার মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে, সেগুলো এড়িয়ে চলুন।

৭. পেশাদার পরামর্শ: যদি এই ভীতি আপনার দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত করে, তবে একজন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বা সাইকোলজিস্টের পরামর্শ নিন। Cognitive Behavioral Therapy (CBT) এই সমস্যা সমাধানে অত্যন্ত কার্যকর।

লেখকঃ প্রফেসর ডঃ মোঃ শাহিনুর রহমান, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

0FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles