Mob_Mentality_মব মেন্টালিটি

মব মেন্টালিটি থেকে সাবধান

মব মেন্টালিটি বা  ক্রাউড মেন্টালিটি

 সংসারটা টিকলোনা শেষ পর্যন্ত। তাই স্বামীর সাথে বিচ্ছেদের পর মেয়ে তুবা আর নিজের মাকে নিয়ে আলাদা বাসায় উঠলেন তাসলিমা বেগম রেণু। অনেক আশাভঙ্গের পর আবারও এক এক করে নতুন স্বপ্নের ডালি সাজাচ্ছিলেন রেণু। সেদিনের ছোট্ট তুবা এখন চার বছরের একটা ফুটফুটে মেয়ে। মেয়েকে এবার স্কুলে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি। ভর্তির ব্যাপারে জানার জন্য একদিন সকালবেলা উঠে বাসার কাছের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গেলেন। প্রধান শিক্ষকের রুমে বসে মেয়ের ভর্তি নিয়ে আলাপ করছিলেন রেণু, এমন সময় কোত্থেকে অপরিচিত কিছু মানুষ এসে হিড়হিড় করে টানতে টানতে রেণুকে রুমের বাইরে নিয়ে কথাবার্তা ছাড়াই গণপিটুনি শুরু করে দিলো। ‘এই মহিলা ছেলেধরা’ বলে মারতে লাগলো সবাই। কয়েকজন থেকে মুহুর্তের মধ্যে শ’খানেক মানুষ হয়ে গেলো সেখানে এবং সবাই বিনাবাক্যে তাকে মারতে লাগলো। ঘন্টাখানেক এই বর্বরতা চলার পর আর না পেরে জীবনের কাছে হেরে গেলেন রেণু। নিথর দেহের বিস্ফোরিত চোখে তখনও বিস্ময়, কি কারণে এমন হলো!

‘পদ্মা সেতুর পিলার দিতে শিশুর মাথা দরকার’ এরকম একটা গুজব প্রচলিত ছিলো তখন দেশে। আর এই গুজবকে ভিত্তি করে ছেলেধরা সন্দেহে উম্মত্ত জনগণের রোষের মুখে পড়ে প্রাণ গিয়েছিলো রেণুদের মতো এরকম নিরীহ কিছু মানুষের।

এতগুলো মানুষের মধ্যে কারোরই মনে হয়নি গুজবটা অযৌক্তিক? অনেক মানুষ একসাথে হলে কেন তাদের আচরণ ভিন্নরূপ ধারণ করে? একসাথে এতগুলো মানুষ মুহূর্তেই কিভাবে এমন অমানবিক হয়ে উঠে? এদের মধ্যে কেউ কি একা একা এরকম কাজ করার সাহস করতো? এ প্রশ্নগুলো দীর্ঘদিন ধরে মনোবিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে এসেছে। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে তাঁরা মানুষের এই আচরণের কারণ ব্যাখার চেষ্টাও করেছেন। সেই ব্যাখাগুলোই এবার একটু দেখার চেষ্টা করবো আমরা।

অধিকাংশ মানুষ কোনো বিষয়ে একমত থাকলে সেটাকে আমরা সঠিক বলে মেনে নিই। বিশেষ করে যখন কোনো বিষয়ে আমাদের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য থাকেনা সেক্ষেত্রে আমরা অন্যদের মতামত বা তথ্যকে গুরুত্ব দিয়ে থাকি। যেমন বর্তমান সময়ে ‘রিভিউ’ ব্যাপারটার কথা ধরা যাক। নতুন একটা মুভি বের হয়েছে এবং অনেকে মুভিটি দেখে ‘বেশ ভালো হয়েছে’ বলে রিভিউও দিয়েছে। ব্যস, আপনিও দেখতে চলে গেলেন। সোশ্যাল সাইকোলজিতে এই ব্যাপারটাকে বলা হয় ‘কনফর্মিটি‘(Conformity) বা মেনে নেওয়া/অনুসরণ করা। সমাজে ‘ফিট’ বা ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে বিবেচিত হতে আমরা আশেপাশের মানুষদের কিছু কিছু আচরণ অনুসরণ করার চেষ্টা করি। এটাই হলো কনফর্মিটি।

কেন আমরা কনফর্ম/অনুসরণ করি?

কোনো পরিস্থিতিতে পড়ে যেনো বোকামি করে না ফেলে সেজন্য নতুন পরিস্থিতিতে মানুষ অন্যের কাজ বা আচরণকে অনুকরণ করে। কি করবে বুঝে উঠতে না পারলে সে পরিবেশেই মানুষ এমন আচরণ করে থাকে। এছাড়া কোনো ব্যাপারে দ্বিমত থাকা স্বত্ত্বেও নিজের থেকে অবস্থানে উপরে থাকা মানুষের বশ্যতা স্বীকার করার জন্যও অনেকসময় মানুষ তার উপরস্ত মানুষটিকে অনুসরণ করতে থাকে।

তবে ১৯৫৫ সালে ডয়েচ(Deutsch) এবং জেরার্ড(Gerard) কনফরমিটির দুটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেন-

১। তথ্যমূলক প্রভাব(Informational influence): যখন কোনো বিষয়ে আমরা সঠিক তথ্যটা জানিনা তখন যে জানে তার তথ্যকে গাইড হিসেবে মেনে নিই, এটা হলো তথ্যমূলক প্রভাব।

২। স্বাভাবিক/ আদর্শ প্রভাব(Normative influence): কোনো ব্যাপারে একমত না হওয়া সত্ত্বেও শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য সেটি করা এবং অনেক মানুষের কাছে পছন্দনীয় হওয়ার জন্য তাদের মতো চলার চেষ্টা করা হলো স্বাভাবিক/আদর্শ প্রভাব।

এই কনফর্মিটির ফলাফল কী হতে পারে?

সমাজে চলার ক্ষেত্রে প্রায় অনেক কিছুতে আমরা অন্যকে অনুসরণ করে থাকি। তবে তার কিছু কিছু সচেতনভাবে হয়ে থাকলেও বেশিরভাগই করি অসচেতনভাবে। মাঝেমাঝে আমরা এমন অনেককিছুই করি শুধুমাত্র অন্যরা করছে বলে, নিজের কন্সাইন্স বা বিবেক দিয়ে পুনরায় বিবেচনা করে দেখিনা। আর এরকম কনফর্মিটি গুলোই আমাদের জন্য অনেক বড় নেতিবাচক প্রভাব বয়ে আনে। এরকম অন্ধ-অনুকরণ মানুষকে সহজে প্রভাবিত করে ফেলতে পারে যখন অধিক মানুষ একসঙ্গে হয়। তারা ভেবেই নেয় যে, এতগুলো মানুষ নিশ্চয় খারাপ কাজ করছেনা।  তখন কোনোরকম বিবেচনা ছাড়াই তারাও একই কাজে লিপ্ত হয়ে যায় (যদি সেটা খারাপও হয়)। কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে অনেক মানুষ একসাথে জড়ো হলে সেখানে যোগ দেওয়া কিংবা অনেকেই করছে বলে কোনকিছু না জেনেই তাদের সাথে যোগ দিয়ে দেওয়ার মানসিকতাকে সোশ্যাল সাইকোলজিস্টরা ‘মব মেন্টালিটি’ (Mob mentality)  বা ‘ক্রাউড মেন্টালিটি'(Crowd mentality) নামে অভিহিত করে থাকেন। অধিকাংশ মানুষের আচরণ দ্বারা মুহুর্তেই প্রভাবিত হয়ে যাওয়াই হলো মব মেন্টালিটি।

মব মেন্টালিটি ভালো না খারাপ?

“The Power of Others: Peer Pressure, Groupthink, and How the People Around Us Shape Everything We Do” এর লেখক মাইকেল বন্ড(Michael Bond) মব মেন্টালিটি সম্পর্কে তাঁর বইয়ে বলেন, ‘এই মানসিকতা ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন করে দিতে পারে!’।

বন্ড বলেন- “জানুয়ারির শেষের দিকে এবং ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতে মিশরীয় বিপ্লব ছিল মব মেন্টালিটির একটি চমৎকার উদাহরণ (যদিও এর অর্জন কিছুটা অপচয় করা হয়েছে)। হোসনি মুবারকের পতনের দাবিতে যারা তাহরির স্কোয়ারে জড়ো হয়েছিলেন, সেদিনটি ছিলো তাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়। মিশরের আলেকজান্দ্রিয়া থেকে আসা একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্যবসায়ী আমাকে বলেছেন: ” ধনী-গরিব, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল স্তরের মানুষ ছিলো এই আন্দোলনে। সব বিভাগ উধাও হয়ে গেছে। প্রত্যেকেরই একটাই উদ্দেশ্য ছিল। আমি সত্যিই কাঁদছিলাম, কারণ এই প্রথম আমি মিশরীয় জনগণকে কোন কিছুতে ভয় না পেতে দেখেছি।”

তাহলে এই উদাহরণ থেকে কি আমরা ভাবতে পারি, মব মেন্টালিটি বেশ ইতিবাচক একটি ব্যাপার? মূলত না। মুদ্রার ওপিঠ এখনো দেখা বাকি। প্রথমে উল্লেখ করা ঘটানায় মব মেন্টালিটি যদি এবার বিচার করে দেখি তাহলে কি বলতে পারি? জনগণের চাপের মুখে কোনো দুঃশাসন কে রুখে দেওয়া যায় যেটা আদায়ের হয়তো আরো বিকল্প রাস্তা আছে। কিন্তু জনগণের রোষের মুখে যে মানুষ প্রাণ হারিয়েছে তার কি কোনো বিকল্প আছে বা আর ফিরে পাওয়া সম্ভব? কখোনই না।

কেন অধিকাংশ ক্ষেত্রে মব মেন্টালিটির ফল নেতিবাচক হয়?

বিবেক বহির্ভূত যেকোন আচরণই খারাপ। যতবড় অপরাধিই হোক তাকে প্রাণে শেষ করে দেওয়ার অধিকার কখনোই সাধারণ মানুষ রাখেনা। মাঝেমাঝে দেখা যায় কোন মানুষ নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য বা অনর্থক ভাবে অপপ্রচার চালিয়ে মানুষদের ক্ষেপিয়ে তোলে এসব ঘটনা ঘটায়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করে বা সুস্থ মাথায় বিচার বিবেচনা করলে কতজন মানুষ এসব নিরীহ হত্যাকান্ডে অংশ নিতে পারবে?

Jaslok Hospital and Research Centre এর কনসালট্যান্ট সাইকোলজিস্ট রিতিকা আগরওয়াল মেহতা (Ritika Aggarwal Mehta) মব মেন্টালিটি নিয়ে বলেন-

“মানুষ অনেকসময় একটা গ্রুপ বা দলের অংশ হয়ে যে কাজ করে ফেলে ব্যক্তিগতভাবে সেকাজ করার কথা তারা কখনো চিন্তাও করতে পারেনা। মাঝেমাঝে কোনো একটা স্লোগান বা গুজবভিত্তিক প্রচারণা মানুষকে এতই উদ্দীপিত করে ফেলে যে, কোনরকম বিচার-বিবেচনা ছাড়াই মানুষ দাঙ্গা বা সহিংসতায় লিপ্ত হয়ে যায়। সে ভেবে নেয়, অনেকের মধ্যে সে কেবলই একজন। কোনো ক্ষতি হলেও তার একার বিচার হবেনা।”

ক্লিনিক্যাল অ্যান্ড ফরেনসিক সাইকোলজিস্ট এবং ‘মাইন্ড মান্ডালা’র সহ প্রতিষ্ঠাতা হাভভি হায়দ্রাবাদওয়ালা  (Havovi Hyderabadwalla) বলেন-

” দলের সাথে থাকলে ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিয়ে কিছু করতে হয়না, কেবল স্রোতে গা ভাসালেই হয়। বিপুল সংখ্যক মানুষের উপস্থিতি একজন মানুষের আত্মপরিচয়েও বড় ভূমিকা রাখে। একাকী কোথাও অবস্থান নিলে বিতাড়িত হওয়ার যে ভয় থাকে কোনো দলের অংশ হয়ে করলে তা থাকেনা। তাই মানুষের ভিড়ে পড়ে গেলে একজন ব্যাক্তির আর ভালো-মন্দের বিচার থাকেনা। এখানে অনেক মানুষ থাকায় সে যেমন নিরাপত্তা পায় তেমনি আবার নিজের ক্ষমতা প্রকাশেরও সুযোগ পায়। মানুষ তখন আর যৌক্তিকভাবে চিন্তা করতে পারেনা।”

বলে রাখা ভালো, কনফর্মিটিতে মানুষ অন্যের আচরণ দ্বারা সাময়িকভাবে প্রভাবিত হয় তবে তার নিজের মূল বিশ্বাস বা ধ্যান-ধারণায় তেমন পরিবর্তন হয়না। কখনো কখনো এমন পরিস্থিতি আসে মানুষ নিজেকেই চিনতে পারেনা,কি করবে বুঝে উঠতে পারেনা। কিন্তু পরে ঠিকই অনুশোচনা তৈরি হয়। অনেক  অপরাধীকে আমরা বলতে শুনি, ‘সঙ্গীর পাল্লায় পড়ে করে ফেলেছি আসলে আমি এটা করতে চায়নি।’ এজন্য আগে নিজেকেই বুঝতে পারা এবং নিজের সম্পর্কে সচেতন হওয়া প্রয়োজন।  কিভাবে এই সেল্ফ-এওয়ারনেস বা আত্মসচেতনতা গড়ে তুলবো সে ব্যাপারে মেহতা আগারওয়াল ৫টি পরামর্শ  দিয়েছেন-

১) কোনোকিছু করার আগে নিজেকে ছোট্ট প্রশ্ন করুন: আমি কেন এটা করছি? যদি আমার কোন উপায় থাকতো, তাহলে আমি কি অন্যভাবে এটা করতাম?

২) একটা ছোট্ট নোটবুক রাখুন। এতে নিজের প্রতিক্রিয়া, অন্যের সাথে আচরণ এবং মানসিক অবস্থা লিখে রাখুন। যদি কোনটা পুনরাবৃত্তি হয় তাহলে বুঝতে হবে এটা আপনার পার্সোনালিটির একটা অংশ। আর নিজের পার্সোনালিটি সম্পর্কে জানা থাকলে যেকোন পরিস্থিতিতে মানুষ নিজেকে ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

৩) আমি আপনার সাথে কিভাবে আচরণ করি এই প্রশ্ন কোনো বন্ধু বা আত্মীয়কে জিজ্ঞেস করে নিজের আচরণ সম্পর্কে ধারণা নিয়ে রাখতে পারেন।

৪) অন্যের জন্য যে কাজ বা প্রতিক্রিয়া আপনি দিচ্ছেন সেটা অন্যজন আপনার জন্য করলে আপনি কেমন অনুভব করবেন?

৫) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নিজের চারপাশ সম্পর্কে সচেতন হওয়া। সবসময় ‘অটোপাইলট’ মুডে থাকবেন না। অন্য এক বা একাধিকজন কিছু করছে বলেই আপনিও তা করে ফেলবেন না। যদিও ছোটবেলা থেকেই আপনি এসব দেখে আসছেন কিন্তু এবার নিজেকে থামান। একবার প্রশ্ন করুন: আসলেই কি আমি এটা করতে চাই?

কোনো মানুষই খারাপ হয়ে পৃথিবীতে জন্ম নেয়না। জন্ম পরবর্তী পরিবেশই তার ভালো-খারাপ নির্ধারণ করে দেয়। পরিস্থিতির শিকার না হয়ে বরং পরিস্থিতিকেই নিয়ন্ত্রণ করা শিখতে হবে আমাদের।

লেখক- আসমা ইসলাম, চতুর্থ বর্ষ, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। Email: [email protected]

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Scroll to Top