চিন্তায় বিকৃতি -Cognitive Distortion

Spread the love

চিন্তার বিকৃতি কি?

আসুন একটু জেনে নেই চিন্তার বিকৃতি কি? চিন্তার বিকৃতি (Cognitive Distortion) হল মানুষের অভ্যাসগত এমন এক ধরনের চিন্তন যা  মোটেও সত্য নয় ও নেতিবাচক পক্ষপাত দোষে দুষ্ট।  এই ধরনের চিন্তার বিকৃতিগুলো সাধারণত আবেগগুলোকে শক্তিশালী করতে ব্যবহৃত হয়। উদাহরণস্বরুপ- একজন ব্যক্তি ভাবতে পারেন, “যখনই আমি নতুন কোন কিছু করতে যাই আমি ব্যর্থ হই, কাজেই আমি সবকিছুতে ব্যর্থ” এটাকে Black or White চিন্তার বিকৃতি (Cognitive Distortion) বলে। চিন্তার বিকৃতিগুলির কারনে মানুষের আবেগ অনুভূতি নেগেটিভ হয় এবং আচার আচরণও নেগেটিভ হয়। চিন্তার বিকৃতি Aron T. Beck সর্বপ্রথম বিষন্নতার কারণ হিসাবে ব্যাখ্যা করেন। পরবর্তীতে দেখা যায় সকল দুঃচিন্তাজনিত সমস্যা, আবেগজনিত সমস্যা,ব্যক্তিত্ব জনিত সমস্যা সহ বেশীরভাগ মানসিক সমস্যার জন্য চিন্তার বিকৃতি দায়ী।

চিন্তায় বেশকিছু ধরনের বিকৃতি হলেও সাধারণত নিচের কগনিটিভ ডিসটরসনগুলি বেশি পাওয়া যায়। সংক্ষেপে সে চিন্তার বিকৃতি (Cognitive Distortion) গুলো এখানে আলোচনা করা হল।

১) Filtering: এই ধরনের বিকৃতিতে একজন ব্যক্তি এমন বিষয়ের উপর মনোযোগ দেয় যা ব্যক্তির বিশ্বাসের সাথে মিলে। এতে সাধারণত ব্যক্তি নেতিবাচক চিন্তাভাবনা গ্রহন করে এবং পজিটিভ চিন্তাগুলিকে ফিল্টারিংয়ের মাধ্যমে বাদ দেয়। উদাহরণস্বরুপ- এ ধরনের ব্যক্তিকে কেউ খারাপ কিছু বললে সেটা নিয়েই তিনি থাকে, বাকি পজিটিভ বিষয়গুলো ফিল্টারিংয়ের মাধ্যমে বাদ দেয়।

২) Polarization: এই ধরনের চিন্তার বিকৃতিতে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সবকিছুর মেরুকরণ করে। এরা সবকিছুই চূড়ান্তভাবে দেখে, তাদের মতে নিখুঁত হতে হবে তা না হলে সবকিছুই ব্যর্থ। এদের কাছে মধ্যবর্তী কিছু নেই। উদাহরণস্বরূপ-কোন ব্যক্তি কাজে একটু খারাপ হলে ভাবতে পারে আমি ব্যর্থ,আমার দ্বারা কিছুই হবে না।

৩) Overgeneralization: এই ধরনের চিন্তার বিকৃতিতে একটা বা দুটি ঘটনার উপর ভিত্তি করে কোন কিছুর ধারণা করে  নেওয়া। একবার কোন খারাপ কিছু ঘটলে তারা মনে করে এটা ঘটতেই থাকবে। উদাহরণস্বরুপ- কেউ কোন এক বিষয়ে ফেল করলে ভাবতে পারে, তার দ্বারা আর পড়াশোনা হবে না।

৪) Jumping into Conclusion: এই চিন্তার বিকৃতিতে ছোট একটা ঘটনার উপর ভিত্তি করে এরা উপসংহার চলে আসে। কেউ একটু খারাপ করে কথা বললেই ভাবে তাকে কোনভাবেই তিনি পছন্দ করে না। তারা সবসময় ভাবে অন্যরা তাদের নেগেটিভভাবে মূল্যায়ন করে।

৫) Catastrophizing: এই ধরনের চিন্তার বিকৃতির ব্যক্তিরা কোন ছোট ঘটনাকে বড় করে দেখে, তারা সামান্যতে বড় দূর্যোগে বা বিপদে পড়তে যাচ্ছে বলে মনে করে।  কোন ঘটনা শুনলে এরা সেটার নিকৃষ্টতম ঘটনা কল্পনা করে। উদাহরণ- কোন ব্যক্তির অসুস্থ হবার খবর শুনলে মনে করে সেই ব্যক্তি মারা যাবে, তার বাচ্চাগুলোর খারাপ কিছু হবে, সংসার নষ্ট হবে ইত্যাদি, অথচ এতদুর যায় নি।

৬) Personalization: এই ধরনের বিকৃতিতে ব্যক্তিরা সবকিছুই ব্যক্তিগতভাবে নেয়। অর্থাৎ সব খারাপ ঘটনার জন্য নিজেকে দায়ী করে এবং দোষ না করেও নিজেকে দোষী মনে করে।  এরা  বিশ্বাস  করে, অন্যরা তাকেই  প্রত্যেক্ষ বা পরোক্ষভাবে উদ্দেশ্য করে সবকিছু করে বা বলে। এইসব ব্যক্তি সব সময় অন্যদের সাথে নিজের তুলনা করে, অন্যদের বুদ্ধিমান, সুন্দর ইত্যাদি মনে করে। যেমন- কোন মহিলা বলতে পারে, আমরা রাতে অনুষ্ঠানে যেতে দেরি করায় অন্যদের অনেক সমস্যা হয়েছিল, তারা আমাদের দেখে হাসাহাসি করছিল, আমি যদি পরিবারকে আগে নিয়ে বের হতাম তাহলে এরকম হতো না। প্রকৃতপক্ষে তাদের নিয়ে অন্যদের ভাবার সময় নেই।

৭) Blaming: এই ধরনের চিন্তার বিকৃতির ব্যক্তিরা নিজের মানসিক যন্ত্রনার জন্য অন্যদের দায়ী করে। বিপরীতভাবে তারা প্রতিটি ঘটনার জন্য নিজেকেও দায়ী মনে করতে পারে। এমনকি যে ঘটনা পরিষ্কারভাবে তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। উদাহরণস্বরুপ- আমাকে কেউ বুঝে না তাই আমার এত কষ্ট।

৮) Should: এই চিন্তার বিকৃতিতে ব্যক্তি, প্রতিটি মানুষ কি ধরনের আচরণ করবে তার নিজস্ব তালিকা করে এবং কোন মানুষ তা না করলে এই ব্যক্তিদের খুব রাগ হয়। তিনি কোন নিজস্ব নিয়ম ভঙ্গ করলে নিজেকে অপরাধী মনে করে। যেমন- এসব ব্যক্তি অনেক সময় ভাবে, তার নিয়মিত ব্যায়াম করা উচিৎ, অলসতা করা উচিৎ না, একদিন ব্যায়াম না করলে নিজেকে অপরাধী মনে হয়।

৯) Emotional Reasoning: এই চিন্তার বিকৃতির ব্যক্তিগুলো ধরেই নেয় তার আবেগগুলো বাস্তবে প্রতিফলিত হয়। আবেগগুলি অত্যন্ত দৃঢ় ও শক্তিশালী হবার কারনে যুক্তিপূর্ণ চিন্তা ও যুক্তিগুলোর চেয়ে শক্তিশালী হয়, এসব আবেগ যুক্তিবাদী চিন্তাভাবনা মুছে দেয়। যেমন- এসব ব্যক্তি মনে করে, ” আমি ষ্টুপিড ও বোরিং অনুভব করছি, মানে আমি ষ্টুপিড ও বোরিং”।

১০) Fallacy of Change: এই ধরনের বিকৃতির ব্যক্তি আশা করে যে, অন্য ব্যক্তিকে পর্যাপ্ত চাপ প্রয়োগ করলে  সে তার উপযুক্ত হয়ে উঠবে কারণ নিজের সাফল্য ও সুখের জন্য তার প্রত্যাশা পুরোপুরি অন্য ব্যক্তির উপর নির্ভরশীল। যেমন- অনেক স্ত্রী এই বিশ্বাস করে যে,  তার স্বামীর চেহারা ও আচরণের উন্নতি করতে চেষ্টা করলে, এই ছোট খাটো কয়েকটি জিনিষের পরিবর্তন তাদের সুখী করবে।

১১) Global labelling: এক্ষেত্রে ব্যক্তি নিজের বা অন্য ব্যক্তির একটি বা দুটি দোষকে জেনারেলাইজ করে। এরা নিজের ব্যর্থতার জন্য অন্যদের দায়ী করে। এসব ব্যক্তি বলে আমি হেরেছি এমন এক পরিস্থিতিতে যেখানে অন্য ব্যক্তিরা একটা নির্দিষ্ট কাজে ব্যার্থ হয়েছিল। একটি বিষয় খারাপ হলে সবকিছুই খারাপ মনে করে। যেমন-  জাপানি সুপ খেতে একজনের খারাপ লাগলো, সে বলবে জাপানি সব খাবারই খারাপ।

১২) Always being Rights: এই ধরনের ব্যক্তিরা নিজের মতামত ও কাজগুলিকে সবসময় একদম ঠিক মনে করে। এসব ব্যক্তিরা  কখনও ভুল করবে এটা অকল্পনীয়, কেননা তারা ভাবে, তারা যা করছে তা সব সময় সঠিক। এরা সব সময় যুক্তি তর্কে জিতবে বলে মনে করে থাকে, কারণ তারা যা করে তাই ঠিক মনে করে।

এই ধরনের কোন চিন্তায় বিকৃতি (Cognitive Distortion) থাকলে কগনিটিভ থেরাপি দিয়ে এ সমস্যা থেকে বের হওয়া যায়। আপনার বা প্রিয়জনের চিন্তায় বিকৃতি হলে দ্রুত মনোবৈজ্ঞানিক সহায়তা গ্রহন করুন ও চিন্তার বিকৃতি দুর করুন।

লেখকঃ জিয়ানুর কবির, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিষ্ট
বি.এস-সি অনার্স ( সাইকোলজি), পিজিটি (সাইকোথেরাপি)
এম.এস ও এম.ফিল (ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি, ঢা.বি.)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.