সমাজ বিরোধী ব্যক্তিত্বঃ সামাজিক হয়েও যখন অসামাজিক!

Spread the love

Antisocial Personality Disorder  (ASPD)

২০১৯ সালের ১৭ নভেম্বর প্রথমআলোয় একটি খবর ছাপা হয় যার শিরোনাম ছিল “সিরিয়াল কিলার’ বাবু শেখ ৬ বছরে করেছেন ১০ খুন”। এতে বলা হয় তিনি ঠাণ্ডা মাথায় ১ শিশু ও ৯ নারী কে হত্যা করেন। খুন করা  ছিল তার নেশা। নওগাঁর রানীনগর উপজেলার এই বাবু শেখ মাছ ধরার আড়ালে এসব অপরাধ করতেন । অবশেষে পুলিশের কাছে ধরা পরে সব কথা  স্বীকার করেন। বাবু শেখের এই আচরণ একদিনে গড়ে উঠে নাই। কিশোর বয়স থেকেই মাছ, মুরগি চুরি শুরু করে, পরবর্তীতে যুক্ত হয় হত্যা ও ধর্ষণ। বাবু শেখের এই আচরণ সমাজ বিরোধী ব্যক্তিত্বের উৎকৃষ্ট উদাহরণ যাকে ইংরেজিতে বলে Antisocial Personality Disorder (ASPD)। এটি ব্যক্তিত্বের একটি গুরুতর অসুখ যা অপরাধ ও সহিংস আচরণের সাথে সম্পর্কিত।

সমাজ বিরোধী ব্যক্তিত্ব ব্যাধি (ASPD) দুটি প্রধান বৈশিষ্ট্য নিয়ে গঠিত-
১. কন্ডাক্ট ডিসঅর্ডার পরিলক্ষিত হয় পনেরো বছর বয়স হওয়ার পূর্বে। শৈশব বা বয়ঃসন্ধিকালীন সময়ে শিশু কিশোরেরা সহিংস, অবিচলিত, অনিয়ন্ত্রিত এবং পুনরাবৃত্তিমূলক আক্রমনাত্বক যে অপরাধমূলক আচরণ করে থাকে তাকেই কন্ডাক্ট ডিসঅর্ডার বলে।

২. কন্ডাক্ট ডিসঅর্ডারের এই প্যাটার্ন প্রাপ্ত বয়স হওয়া পর্যন্ত পরিলক্ষিত হয়। মায়ার্স, স্টুওয়ার্ট এবং ব্রাউন ১৯৯৮ সালে তাদের এক গবেষণায় তুলে ধরে ৬০% শিশু যাদের মধ্যে আচরণ ব্যাধি আছে, পরবর্তীতে তাদের মধ্যে ASPD গড়ে উঠেছে।

একজন পূর্ণবয়স্ক ASPD ব্যক্তির যেসব আচরণ দেখা যায় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- দায়িত্বহীনতা, সামঞ্জস্যহীনতা, আইনলঙ্ঘন করা, শারিরীকভাবে আক্রমণাত্মক আচরণ করা, বেপরোয়া আচরণ করা, নির্ধারিত পরিকল্পনা মতো অগ্রসর হতে না পারা এবং কৃতকর্মের প্রতি তাদের অনুশোচনা না করা।

ASPD কাদের হয় এবং কারা বেশি ঝুকিপূর্ণ?
২০১৯ সালে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় উঠে এসেছে যে, বিশ্বে প্রায় ৭.৮% মানুষ ব্যক্তিত্বের অসুখে ভুগে থাকে যাকে বলে পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার। এ সংখ্যা উন্নত দেশ গুলোতে ৯.৬ শতাংশ আর আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশে এর হার ৪.৩ শতাংশ (Winsper, et al,. ২০১৯)।

২০০৭ এবং ২০১৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, প্রাপ্ত বয়স্ক ৭.৪ মিলিয়ন আমেরিকানদের মধ্যে এই সমাজ বিরোধী ব্যক্তিত্ব পাওয়া গিয়েছিল। এদের মধ্যে ৩% পুরুষ এবং ১% নারী ছিল (Andrea et al., ২০১৩)। অর্থাৎ নারীদের তুলনায় পুরুষের মধ্যে ASPD বেশি হয়।

নিম্ন আর্থ-সামাজিক শ্রেণির মানুষের মধ্যে ASPD হওয়ার ঝুঁকি বেশি। তাছাড়া মাদকাসক্তির সাথেও এই ASPD সম্পর্ক রয়েছে। Oguizu এবং তার সহযোগীরা ২০২০ সালে নাইজেরিয়ায় পরিচালিত এক জরিপে দেখেছেন যে, ASPD সাথে মাদক দ্রব্যে আসক্তিজনিত ব্যাধির উপসর্গ সমূহ সরাসরি সম্পর্কিত।

ASPD গড়ে উঠার কারণ
যদিও ASPD গড়ে উঠার পেছনে সঠিক কারণ এখনো জানা যায়নি তবে, বিভিন্ন গবেষণা থেকে এটা ধারণা করা হয় যে, ব্যক্তিত্বের ত্রুটি জনিত এ রোগের পিছনে, পারিবারিক, মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবের পাশাপাশি জীনগত ও পরিবেশের প্রভাব রয়েছে প্রায় ৩৮%-৬৯% (DeLisi, et al,. 2019) ।

জীনগত প্রভাব
ASPD গড়ে উঠার পেছনে অনেক বিজ্ঞানী জীনগত প্রভাবকেই বেশি দায়ী করেছেন। ২০০২ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে ডাইজাইগোটিক(ভ্রাতৃসম) যমজ সন্তানের তুলনায় মনোজাইগোটিক(অভিন্ন) যমজ সন্তানের মধ্যে ASPD গড়ে উঠার প্রবণতা বেশি।

অন্য একটি গবেষণায় উঠে এসেছে একটি বিশেষ জীন ASPD গড়ে উঠার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।গবেষক “Monoamine Oxidase A (MAOA)” জীনকে চিহ্নিত করছেন, যেটি ASPD গড়ে উঠার জন্য দায়ী। MAOA জীন মানব মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটার যেমনঃ নরএপিনেফ্রিন, ডোপামিন এবং সেরোটোনিন এর ক্রিয়াকার্য ভেঙ্গে দেয়, ফলস্বরূপ ব্যক্তির মধ্যে আক্রমনাত্মক আচরণ করার প্রবণতা দেখা যায় (Caspi et al., 2002)।

পারিবারের প্রভাব
পিতামাতার আচার-আচরণ, বিবাহ-বিচ্ছেদ বা মৃত্যু, পারিবারিক অশান্তি, সঠিক প্যারেন্টিং এর অভাব, পারবারিক শিক্ষা, এবং সহপাঠীর অসৎ সঙ্গ থেকে এবং তা অনুকরণের মাধ্যমে অ্যান্টি সোশ্যাল জীবনচর্চা তৈরি হয় যা পরবর্তীতে ASPD অসুখে রূপ নেয়।

পরিবেশগত প্রভাব
১৯৯৫ সালে একদল গবেষক দেখিয়েছেন কোন ASPD পিতামাতা হতে কোন সন্তান যদি দত্তক নেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে দত্তককৃত সন্তানের পিতামাতা যদি বিরূপ পরিবেশে সন্তানকে লালন পালন করে, তাহলে তাদের সন্তানের মধ্যে ASPD গড়ে উঠে অন্যথায় না (Cadoret et al., 1995)। সুতরাং, জীনগত প্রভাবের পাশাপাশি পরিবেশগত প্রভাবও যে রয়েছে তা এই গবেষণা থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়।

মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব
শৈশবে কেউ এবিউস কিংবা নির্যাতনের স্বীকার হলে সে ঘটনা অবদমিত করে রাখে। পরবর্তীতে অনুরুপ কোন ঘটনার বা পরিস্তিতির মাধ্যমে ব্যক্তির ঐ কষ্টকর অবস্থা যদি প্রতিভাত হয় তখন ব্যক্তি ASPD অন্তর্ভুক্ত আচরণসমূহ করে থাকে। এছাড়াও Classical Conditioning (অনুবর্তন তত্ত্ব) এবং Operant Conditioning (সক্রিয় অনুবর্তন) তত্ত্বের সাহায্যে ASPD গড়ে উঠাকে বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, উভয় তত্ত্বে ব্যক্তি কষ্টদায়ক উদ্দীপক বস্তু (ইলেকট্রিক শক) থেকে দূরে থাকতে চায়। কিন্তু ASPD ব্যক্তি কষ্টদায়ক উদ্দীপনা থেকে দূরে সরে থাকতে পারে না। একারণেই শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে ASPD ব্যক্তিদের কোন বাঞ্ছিত আচরণ শেখানো সম্ভব হয় না (Eysenck, 1957)।

ASPD ব্যক্তি নিজেই নিজেকে পুরষ্কৃত করে এবং প্রেরণা যোগায় ফলস্বরূপ ব্যক্তি নেতিবাচক আচরণের পুনরাবৃত্তি করতে পছন্দ করে। শাস্তিযোগ্য এমন আচরণ থেকে বিরত থাকতে ASPD ব্যক্তি একেবারেই অনিচ্ছুক। তাই দেখা যায় বার বার শাস্তি প্রদান করা সত্ত্বেও ASPD ব্যক্তি একই অবাঞ্ছিত আচরণ করেই চলেছে। উপরিউক্ত কারনেই, ASPD ব্যক্তি অতিমাত্রায় আবেগ তাড়িত পরিলক্ষিত হয়, খুব দেরিতে আনন্দ উপভোগ করে এবং ঠিকমতো সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারে না।

প্রতিরোধ
রোগের “প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম’’ একটি অনস্বীকার্য উক্তি। তবে সমাজ বিরোধী ব্যক্তিত্ব ব্যধির ক্ষেত্রে সঠিক কোন প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেই। তবে, রোগীর পিতামাতা, শিক্ষক, সহপাঠী এবং শিশু বিশেষজ্ঞ রোগের পূর্বলক্ষণ দেখে রোগ নির্নয় করতে পারলে এবং দ্রুত চিকিৎসা সেবা নিতে পারলে এই সমাজ বিরোধী ব্যক্তিত্ব প্রতিরোধ করা সম্ভ্যব। ২০১৪ সালে Joel Yager নামে এক গবেষক তার গবেষণায় – ASPD শুরুর প্রাথমিক পর্যায়ে থাকা ৩ থেকে ৭ বছরের ১২০ জন শিশুর পিতা-মাতাকে ১৩ থেকে ১৬ সপ্তাহ প্যারেন্টিং ট্রেনিং দেন। এতে দেখতে পান ঐ শিশুদের সমাজ বিরোধী ব্যক্তিত্বের লক্ষণ উল্লেখ্যযোগ্য ভাবে কমে যায়।

 চিকিৎসা
সমাজ বিরোধী ব্যক্তিত্বের চিকিৎসা করা এক রকম বলতে গেলে চ্যালেঞ্জিং। কেননা এ ক্ষেত্রে ব্যক্তির মধ্যে খুবই অল্প প্রেরণা কাজ করে। নিজেদের আচরণগত এ সমস্যাকে তারা সমস্যা মনে করে না এবং খুবই কম ক্ষেত্রে আচরণগত পরিবর্তন আনার উপলব্ধি করে। ট্রিটমেন্ট এবং সাইকোথেরাপী ব্যক্তির দৃশ্যমান আচরণ কেন্দ্রীক হয়ে থাকে। সমাজ বিরোধী ব্যক্তিত্বের এ গোলযোগ নিরাময়ে উল্লেখযোগ্য থেরাপি সমূহ হলো-

সাইকোটিক ড্রাগ: ASPD ব্যক্তির উপর সাইকোটিক ড্রাগের দীর্ঘ মেয়াদী ফলপ্রসূতা খুবই অল্প সংখ্যক গবেষণায় উঠে এসেছে। তবে অনেক গবেষক কিছু কিছু ড্রাগের স্বল্প মাত্রায় কার্যকারিতা পেযেছেন।

সাইকোথেরাপির মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্যে হলো-

আচরণগত থেরাপি: এক্ষেত্রে ব্যক্তির দৃশ্যমান সমস্যা কেন্দ্রিক আচরণের ছোট ছোট পরিবর্তনের মাধ্যমে অবাঞ্ছিত আচরণ দূর করানো হয়। এক্ষেত্রে সুস্পষ্ট কিছু ছোট ছোট লক্ষ্য ঠিক করা হয় এবং সে অনুসারে থেরাপি প্রদান করা হয়।

দলগত থেরাপি: দলগত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ব্যক্তির সামাজিক দক্ষতা, রাগ এবং আবেগ নিয়ন্ত্রনণের কলাকৌশল শেখানো হয়।

কগনিটিভ থেরাপিঃ Beck and Freeman’s, 1990 এর সমসাময়িক কগনিটিভ থেরাপির মূল লক্ষ্য চিন্তন বিকৃতির পরিবর্তন সাধনের মাধ্যমে,  ব্যক্তির সামাজিক এবং নৈতিক আচরণের উন্নতি করা।

লেখকঃ মোঃ ইয়াসীন আরাফাত, ৩য় বর্ষ অধ্যয়নরত, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। ই-মেইলঃ [email protected]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.